জলবায়ু পরিবর্তন ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় বন্যার ঝুঁকি বাড়ছে। উচ্চ মাত্রায় গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ অব্যাহত থাকলে ২১০০ সাল নাগাদ বাংলাদেশে বছরে প্রায় ১ কোটি ৭৫ লাখ মানুষ উপকূলীয় বন্যার পানির সংস্পর্শে আসতে পারে। একই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের মতো উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা বদ্বীপ অর্থনীতিতে উপকূলীয় বন্যার বার্ষিক ক্ষতি মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১৫ শতাংশের সমান হতে পারে।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ‘এশিয়া-প্যাসিফিক ক্লাইমেট রিপোর্ট ২০২৬: কোস্টাল রিস্কস অন দ্য রাইজ—অ্যাকশনস ফর এ রেজিলিয়েন্ট ফিউচার’ (Asia–Pacific Climate Report 2026: Coastal Risks on the Rise—Actions for a Resilient Future) শীর্ষক প্রতিবেদনে এ পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। ২১ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনটিতে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের উপকূলীয় ঝুঁকি, সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ক্ষতি এবং তা মোকাবিলায় অভিযোজন ও সুরক্ষাব্যবস্থা জোরদারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনের হিসাবে, উচ্চ নিঃসরণ পরিস্থিতি—এসএসপি৫-৮.৫—অব্যাহত থাকলে ২১০০ সাল নাগাদ বাংলাদেশে বছরে প্রায় ১ কোটি ৭৪ লাখ ৫৪ হাজার মানুষ উপকূলীয় বন্যার পানির সংস্পর্শে আসতে পারে। এখানে এমন জনসংখ্যাকে বোঝানো হয়েছে, যারা বছরে ১৫ সেন্টিমিটারের বেশি গভীরতার উপকূলীয় বন্যার পানির সংস্পর্শে আসতে পারে। এটি বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা নয়।
ভূমি অবনমন ও লবণাক্ততায় বাড়ছে ঝুঁকি
বাংলাদেশের উপকূলীয় ঝুঁকি বাড়ার পেছনে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির পাশাপাশি বদ্বীপের ভূমি অবনমনও ভূমিকা রাখছে। এডিবির প্রতিবেদনে উদ্ধৃত তথ্য অনুযায়ী, গঙ্গা–ব্রহ্মপুত্র–মেঘনা বদ্বীপে ভূমি বছরে গড়ে ৪ মিলিমিটার দেবে যাচ্ছে। কোনো কোনো স্থানে এ হার সর্বোচ্চ ৫৫ মিলিমিটার।
সর্বোচ্চ অবনমনের এই হার পুরো বদ্বীপের জন্য প্রযোজ্য নয়; এটি বিভিন্ন স্থানে ভূমি দেবে যাওয়ার হারের পার্থক্য বোঝায়। তবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও ভূমি অবনমনের সম্মিলিত প্রভাবে নিচু উপকূলীয় এলাকায় প্লাবনের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশও উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকায় চাপ তৈরি করছে। এতে কৃষিজমি, সুপেয় পানির উৎস ও স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই বন্যা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি পানির নিরাপত্তা, কৃষি ও জীবিকার স্থিতিস্থাপকতা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
২০৫০ সালের মধ্যে বাস্তুচ্যুত হতে পারে ১ কোটি ৩৩ লাখ মানুষ
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, সুপেয় পানির সংকট ও কৃষি উৎপাদন হ্রাসের সম্মিলিত প্রভাবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ জলবায়ু অভিবাসনের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। এডিবির প্রতিবেদনে উদ্ধৃত ২০১৮ সালের একটি গবেষণা অনুযায়ী, এসব কারণে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে সর্বোচ্চ ১ কোটি ৩৩ লাখ মানুষ দেশের ভেতরেই বাস্তুচ্যুত হতে পারে।
এটি এডিবির নিজস্ব নতুন প্রক্ষেপণ নয়; প্রতিবেদনটিতে আগের গবেষণার হিসাব হিসেবে তথ্যটি তুলে ধরা হয়েছে। সমুদ্রের পানি স্থলভাগে ঢুকে পড়া, কৃষিজমির উৎপাদনক্ষমতা কমে যাওয়া কিংবা সুপেয় পানির উৎস লবণাক্ত হয়ে পড়ার মতো দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনে মানুষকে বসতি ও জীবিকার জায়গা ছাড়তে হতে পারে।
এ ধরনের স্থানান্তরের প্রভাব শুধু ঘরবাড়ি হারানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। কর্মসংস্থান, সামাজিক সম্পর্ক, স্থানীয় সংস্কৃতি ও পরিচিত পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়। নতুন জায়গায় গিয়ে বাসস্থান, কাজ, নিরাপদ পানি ও প্রয়োজনীয় সেবা পাওয়ার অনিশ্চয়তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করতে পারে।
বাড়বে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক ক্ষতি
এডিবির প্রতিবেদনে মূল্যায়ন করা এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ৩০টি উপকূলীয় উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে উপকূলীয় বন্যার কারণে বর্তমানে বছরে আনুমানিক ২ হাজার ৭০০ কোটি ডলারের ক্ষতি হয়। প্রয়োজনীয় অভিযোজনব্যবস্থা না নেওয়া হলে মাঝারি নিঃসরণ পরিস্থিতিতে বার্ষিক ক্ষতি ২০৫০ সালে প্রায় ১৭ হাজার ২৪০ কোটি এবং ২১০০ সালে ৫২ হাজার ২০ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে।
উচ্চ নিঃসরণ পরিস্থিতিতে ক্ষতির পরিমাণ ২০৫০ সালে প্রায় ১৯ হাজার ৯১০ কোটি এবং ২১০০ সালে ৭৩ হাজার ৮৭০ কোটি ডলার হতে পারে। এসব হিসাব ৩০টি অর্থনীতির সম্মিলিত পূর্বাভাস; বাংলাদেশের একক ক্ষতির পরিমাণ নয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের মতো উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা বদ্বীপ অর্থনীতিতে উপকূলীয় বন্যার বার্ষিক ক্ষতি জিডিপির প্রায় ১৫ শতাংশের সমান হতে পারে। এ ক্ষতি বসতবাড়ি ও অবকাঠামোর পাশাপাশি বন্দর, বাণিজ্য, কৃষি, মৎস্য, পর্যটন ও সরবরাহব্যবস্থার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
ক্ষতি কমাতে উপকূল সুরক্ষায় বছরে ৯০০ কোটি থেকে ১ হাজার ৯০০ কোটি ডলার বিনিয়োগের প্রয়োজন হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ধরনের বিনিয়োগের মাধ্যমে বছরে ১৭ হাজার ৮০০ কোটি থেকে ৩৬ হাজার কোটি ডলারের সম্ভাব্য বন্যাজনিত ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হতে পারে। তবে এই বিনিয়োগ ও সম্ভাব্য সাশ্রয়ের হিসাবও অঞ্চলভিত্তিক; বাংলাদেশের জন্য নির্ধারিত অর্থের পরিমাণ নয়।
ডেল্টা পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বড় অর্থায়ন প্রয়োজন
বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অভিযোজন পরিকল্পনার উদাহরণ হিসেবে এডিবির প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান ২১০০-এর কথা বলা হয়েছে। ২০১৮ সালে প্রণীত এই পরিকল্পনায় বন্যা, লবণাক্ততা, কৃষি, বাস্তুতন্ত্র ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিষয়গুলোকে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের আওতায় আনার চেষ্টা করা হয়েছে।
পরিকল্পনার আওতায় নির্বাচিত ৮০টি প্রকল্প বাস্তবায়নে ২০৪০ সাল পর্যন্ত পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়সহ আনুমানিক ৫ হাজার ২০০ কোটি ডলার প্রয়োজন হতে পারে। পরিকল্পনায় বদ্বীপ-সম্পর্কিত ব্যয় বছরে জিডিপির প্রায় ২ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে।
এডিবির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পরিকল্পনার মোট ব্যয়ের প্রায় ৯৯ শতাংশ সরকারি উৎস থেকে জোগাড় করতে হতে পারে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন নিশ্চিত করা, প্রকল্পের অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং প্রাপ্য অর্থের সঙ্গে বাস্তবায়নের সময়সূচি সমন্বয় করা বড় চ্যালেঞ্জ।
দীর্ঘমেয়াদি অভিযোজন ও ঝুঁকিভিত্তিক পরিকল্পনার তাগিদ
এডিবির প্রতিবেদনে উপকূলীয় ঝুঁকি মোকাবিলায় উন্নয়ন পরিকল্পনায় জলবায়ু ঝুঁকি বিবেচনা, প্রতিষ্ঠান ও সুশাসন শক্তিশালী করা, অর্থায়নের নতুন উৎস তৈরি এবং স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোজন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বাঁধ ও অন্যান্য সুরক্ষা অবকাঠামোর পাশাপাশি সুপেয় পানির ব্যবস্থা, জলবায়ু-সহনশীল কৃষি, প্রাকৃতিক প্রতিবেশ সংরক্ষণ এবং সম্ভাব্য অভিবাসনের গন্তব্য এলাকায় আবাসন ও কর্মসংস্থানের প্রস্তুতিও গুরুত্বপূর্ণ। উপকূলীয় এলাকায় কোথায় কী ধরনের উন্নয়ন হবে, তা নির্ধারণের সময় ভবিষ্যতের বন্যার ঝুঁকি বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও ভূমি অবনমনের প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে আরও তীব্র হতে পারে। তাই এখনকার বিনিয়োগ ও পরিকল্পনার সিদ্ধান্ত আগামী কয়েক দশকে মানুষের জীবন, জীবিকা, অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর প্রভাব ফেলবে। এডিবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উপকূলীয় ঝুঁকি মোকাবিলায় বিচ্ছিন্ন ও স্বল্পমেয়াদি উদ্যোগের বদলে দীর্ঘমেয়াদি, অভিযোজনযোগ্য এবং ঝুঁকিভিত্তিক পরিকল্পনা প্রয়োজন।