বিজ্ঞাপন

খারাপ বাতাসের ঝুঁকিতে বিশ্বের ৩৪% মানুষ, তালিকায় ঢাকাও

metro-city-buildings-cityscape.png
ভূমিস্তরের ওজোন দূষণের প্রতীকী ছবি: ম্যাগনিফিক

তীব্র তাপপ্রবাহ, দাবানল ও মানবসৃষ্ট ক্ষতিকর নিঃসরণের প্রভাবে চলতি বছরে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য একটি জনগোষ্ঠী উচ্চমাত্রার ভূমিস্তরের ওজোনের সংস্পর্শে এসেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) কোপার্নিকাস ক্লাইমেট অ্যাটমোস্ফিয়ার মনিটরিং সার্ভিসের (সিএএমএস) বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১ জানুয়ারি থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিশ্বের ৩৪ শতাংশ মানুষ ‘অত্যন্ত খারাপ’ মানের ওজোন দূষণের সংস্পর্শে ছিল। আর ‘খুব খারাপ’ মানের ওজোনের সংস্পর্শে ছিল ১৭ শতাংশ মানুষ।

সিএএমএস উপগ্রহভিত্তি তথ্য ও কম্পিউটার মডেল ব্যবহার করে বায়ুদূষণ ও দাবানলের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে ‘আটমোস্ফিয়ার ওয়াচ’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে। এতে জলবায়ু পরিবর্তন ও বায়ুদূষণের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও তুলে ধরা হয়েছে।

তাপ ও সূর্যের আলোয় তৈরি হয় ‘ভূমিস্তরের ওজোন’

ভূমিস্তরের ওজোন বায়ুমণ্ডলের ওপরের সুরক্ষাকারী ওজোনস্তর থেকে আলাদা। যানবাহন, শিল্পকারখানা ও দাবানল থেকে নির্গত বিভিন্ন দূষক সূর্যের আলো ও তাপের উপস্থিতিতে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে ভূমিস্তরের ওজোন তৈরি করতে পারে। বায়ুমণ্ডলের ওপরের স্তরের ওজোন আমাদের অতিবেগুনি রশ্মি থেকে বাঁচালেও বেশি মাত্রায় ভূমিস্তরের ওজোন গ্যাস শ্বাসতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর। এটি ফুসফুসের কোষ ধ্বংস করে অ্যাজমা বা হাঁপানির সমস্যা বাড়াতে এবং অন্যান্য জটিল শ্বাসকষ্টজনিত রোগের জন্ম দিতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ২০২১ সালের বায়ুমান নির্দেশিকায় ওজোনের জন্য ৮ ঘণ্টার গড় হিসেবে প্রতি ঘনমিটার বাতাসে ১০০ মাইক্রোগ্রাম নির্দেশক মাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এটি ‘নিরাপদ’ বা ক্ষতিহীন হওয়ার কোনো কঠোর সীমা নয়; ডব্লিউএইচও এটিকে স্বাস্থ্যভিত্তিক বায়ুমান নির্দেশিকা হিসেবে নির্ধারণ করেছে।

এশিয়ায় সবচেয়ে বেশি ওজোন এক্সপোজার

সিএএমএস-এর বিশ্লেষণে এশিয়াকে সবচেয়ে বেশি ওজোন এক্সপোজারের অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। মহাদেশটির ৫৩ শতাংশ মানুষ ‘অত্যন্ত খারাপ’ এবং আরও ২২ শতাংশ ‘খুব খারাপ’ মাত্রার ওজোনের সংস্পর্শে ছিল।

শিল্পায়ন, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও পরিবহন খাতের নিঃসরণের পাশাপাশি দাবানল এবং কৃষিজ অবশিষ্টাংশ পোড়ানো এশিয়ায় ওজোন তৈরির উপাদান বাড়াতে ভূমিকা রাখছে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।

অত্যন্ত খারাপ ওজোনমাত্রার শহরগুলোর মধ্যে ভারতের নয়াদিল্লি, বাংলাদেশের ঢাকা, চীনের চংচিং এবং পাকিস্তানের লাহোরের নামও রয়েছে। অর্থাৎ সিএএমএস-এর এই বৈশ্বিক বিশ্লেষণে ঢাকাও উচ্চমাত্রার ভূমিস্তরের ওজোনের সংস্পর্শে থাকা শহরগুলোর তালিকায় এসেছে।

তাপপ্রবাহ ও দাবানলে ইউরোপ-উত্তর আমেরিকায়ও চাপ

চলতি বছরে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন এলাকায় তীব্র তাপপ্রবাহ ও দাবানল ওজোন দূষণ বাড়াতে ভূমিকা রেখেছে। দাবানলের ধোঁয়া স্থানীয় সীমানার বাইরে দূরবর্তী এলাকাতেও পৌঁছেছে।

সিএএমএস-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, উত্তর আমেরিকার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এবং ইউরোপের ৪৫ শতাংশ মানুষ ‘খারাপ’ বা ‘খুব খারাপ’ বায়ুমানের সংস্পর্শে ছিল।

ইউরোপীয় পরিবেশ সংস্থার (ইইএ) কর্মকর্তা ইয়ান মারনানে এক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে বলেন, ইউরোপে প্রতিবছর প্রায় ৬০ হাজার অকালমৃত্যুর সঙ্গে ওজোন দূষণের সম্পর্ক রয়েছে।

সীমান্ত মানে না দূষণ

দাবানলের ধোঁয়া, ওজোন এবং অন্যান্য দূষক এক দেশ বা অঞ্চলের সীমানায় আটকে থাকে না। সিএএমএস-এর পরিচালক লরেন্স রুইলের ভাষায়, বায়ুদূষণ হাজার হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে মহাদেশ ও মহাসাগর অতিক্রম করতে পারে এবং উৎসস্থল থেকে বহু দূরের এলাকার বায়ুমানেও প্রভাব ফেলতে পারে।

ইন্দোনেশিয়ায় চলতি বছর বড় ধরনের দাবানলও হয়েছে। সিএএমএস-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, চলমান এল নিনো পরিস্থিতি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আরও দাবানলের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে এটিকে সম্ভাব্য প্রভাব হিসেবে দেখা হয়েছে, নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে নয়।

আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার চিত্র

আফ্রিকায় বনভূমির আগুন, ফসলের অবশিষ্টাংশ পোড়ানো ও রান্নার ধোঁয়া বায়ুদূষণের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে উঠে এসেছে। একই সঙ্গে সাহারা মরুভূমির ধূলিকণা দীর্ঘ দূরত্ব পাড়ি দিয়ে ইউরোপ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।

সিএএমএস-এর হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরে আফ্রিকার ৮ শতাংশ মানুষ ‘অত্যন্ত খারাপ’ বায়ুমানের সংস্পর্শে ছিল। আরও ১৯ শতাংশের ক্ষেত্রে বায়ুমান ছিল ‘খারাপ’ বা ‘খুব খারাপ’

দক্ষিণ আমেরিকায় ব্রাজিলের সাও পাওলোতে ওজোনের মাত্রা খুব বেশি এবং রিও ডি জেনিরোতে অত্যন্ত বেশি ছিল। তবে মহাদেশটির ৮১ শতাংশ মানুষ ‘ভালো’ বা ‘গ্রহণযোগ্য’ ওজোনমাত্রার সংস্পর্শে ছিল।

ওশেনিয়ায় পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে ভালো ছিল। অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডসহ এ অঞ্চলের ৬৬ শতাংশ মানুষ ‘ভালো’ এবং ৩৪ শতাংশ ‘গ্রহণযোগ্য’ মাত্রার ওজোনের সংস্পর্শে ছিল বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।