বিজ্ঞাপন

সৌরশক্তির ১২ প্রযুক্তি রপ্তানিতে কড়াকড়ির প্রস্তাব চীনের

Solar_cell_farm.jpg
সূর্য থেকে বিকল্প শক্তি উৎপাদনের উদ্দেশ্যে স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র। ছবি: ম্যাগনিফিক

সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের ১২টি প্রযুক্তিসহ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও জৈবচিকিৎসা খাতের ৪০টি প্রযুক্তি বিদেশে হস্তান্তরে নিষেধাজ্ঞা ও বিধিনিষেধ আরোপের প্রস্তাব করেছে চীন। জাতীয় নিরাপত্তা সুরক্ষা এবং প্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত বা অনুপযুক্ত ব্যবহার ঠেকানোর যুক্তিতে এই উদ্যোগ নিয়েছে দেশটির সরকার। প্রস্তাবিত নিয়ন্ত্রণ কার্যকর হলে উন্নত সৌরপ্রযুক্তির আন্তর্জাতিক হস্তান্তর ও বিভিন্ন দেশের উৎপাদন পরিকল্পনায় প্রভাব পড়তে পারে।

গত শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় প্রযুক্তি রপ্তানির তালিকা সংশোধনের খসড়া প্রকাশ করে। এতে জনমত গ্রহণের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত। প্রস্তাবিত তালিকার ১৪টি প্রযুক্তি রপ্তানি নিষিদ্ধ এবং ২৬টি প্রযুক্তি রপ্তানি সীমিত করার কথা বলা হয়েছে।

খসড়াটি চূড়ান্ত হওয়ার আগপর্যন্ত সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি বিদেশে হস্তান্তরের ক্ষেত্রে নিবন্ধনের একটি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থাও চালু করেছে চীন সরকার। এই ব্যবস্থা ১৬ অক্টোবর থেকে কার্যকর হয়েছে। তবে প্রস্তাবিত নিষেধাজ্ঞা ও রপ্তানি-অনুমোদনের বিধানগুলো এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

কোন কোন সৌরপ্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণের আওতায় আসছে

প্রস্তাবিত তালিকায় পলিসিলিকন উৎপাদন, সিলিকন ওয়েফার তৈরি এবং সৌরকোষ উৎপাদনের ১২টি প্রযুক্তি রয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি প্রযুক্তি রপ্তানি নিষিদ্ধ করার এবং অন্য কয়েকটি কঠোর নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে পেরোভস্কাইট সৌরকোষ এবং পেরোভস্কাইট-সিলিকন ট্যান্ডেম সৌরকোষ তৈরির নির্দিষ্ট প্রযুক্তি। ট্যান্ডেম সৌরকোষে সূর্যালোক শোষণকারী একাধিক স্তর ব্যবহার করা হয়। এর মাধ্যমে সূর্যালোকের আরও বিস্তৃত অংশ কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের দক্ষতা বাড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়।

এ ছাড়া নির্দিষ্ট ধরনের পাতলা সিলিকন ওয়েফার উৎপাদন এবং বড় পরিসরে ফ্লুইডাইজড-বেড পদ্ধতিতে পলিসিলিকন তৈরির প্রযুক্তিও নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব রয়েছে। পলিসিলিকন সৌরকোষ তৈরির গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল। প্রচলিত সিমেন্স পদ্ধতির তুলনায় ফ্লুইডাইজড-বেড পদ্ধতিতে কম খরচ ও কম জ্বালানি ব্যবহার করে পলিসিলিকন উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে।

অন্যদিকে, টপকন (TOPCon), হেটারোজাংশন (HJT) এবং ব্যাক-কন্টাক্ট বা এক্সবিসি (XBC) প্রযুক্তিতে উন্নত সৌরকোষ তৈরির নির্দিষ্ট প্রক্রিয়াগুলো পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার পরিবর্তে রপ্তানি সীমিত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এসব প্রযুক্তি বিদেশে হস্তান্তরের ক্ষেত্রে সরকারি অনুমোদন প্রয়োজন হতে পারে।

এখানে উল্লেখযোগ্য, প্রস্তাবিত নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি ও উৎপাদনপ্রক্রিয়া বিদেশে হস্তান্তর। সৌর প্যানেল বা তৈরি সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জামের সব ধরনের রপ্তানি বন্ধ করার প্রস্তাব এটি নয়।

কেন এই নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ

চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, সৌরবিদ্যুৎ-সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি এখন মহাকাশ গবেষণা ও জাতীয় প্রতিরক্ষার মতো সংবেদনশীল ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে এসব প্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত হস্তান্তর ও অনুপযুক্ত ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলা বা অনুপযুক্তভাবে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি ঠেকানোর পাশাপাশি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতে স্বাভাবিক আন্তর্জাতিক বিনিময় ও সহযোগিতা বজায় রাখাও এই উদ্যোগের লক্ষ্য।

চীনের নতুন প্রস্তাবটি এমন সময়ে এসেছে, যখন উন্নত প্রযুক্তির বাজারে দেশটির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন অর্থনীতির প্রতিযোগিতা চলছে। সৌর প্যানেল উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিতে চীনের অবস্থান শক্তিশালী। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত নিজস্ব সৌরশিল্পের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।

এর আগে উন্নত সৌর প্যানেল উৎপাদন প্রযুক্তির সম্ভাব্য রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চীনা কর্মকর্তারা উৎপাদকদের সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন। নতুন প্রস্তাব কার্যকর হলে চীনা প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল বিদেশি উৎপাদকদের প্রযুক্তি স্থানান্তর ও উৎপাদন সম্প্রসারণের পরিকল্পনায় প্রভাব পড়তে পারে।

তবে এই নিয়ন্ত্রণের ফলে বিশ্বজুড়ে সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় কতটা বাড়বে কিংবা পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে রূপান্তরের গতি কতটা কমবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

এআই ও জৈবচিকিৎসা প্রযুক্তিও তালিকায়

সৌরপ্রযুক্তির পাশাপাশি এআই খাতের ২৩টি এবং জৈবচিকিৎসা খাতের পাঁচটি প্রযুক্তি প্রস্তাবিত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

এআই-সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তির মধ্যে রয়েছে উন্নত এআই মডেল, এআই এজেন্ট, কম্পিউটিং ক্লাস্টার এবং তথ্য প্রক্রিয়াকরণ-সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি। তালিকায় ক্ষতিকর কোড তৈরি ও পরিবর্তনে সক্ষম এআই প্রযুক্তিও রয়েছে। জৈবচিকিৎসা খাতে কোষ ও জিন থেরাপি এবং ক্ষুদ্র নিউক্লিক অ্যাসিডভিত্তিক ওষুধ তৈরির কিছু প্রযুক্তি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

চীনের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, উন্মুক্ত উৎসে প্রকাশিত বা গবেষণাপত্রের মাধ্যমে জনপরিসরে আসা এআই প্রযুক্তি প্রস্তাবিত নিয়ন্ত্রণের আওতায় পড়বে না। কিছু প্রযুক্তির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শর্তে সহজতর অনুমোদনপ্রক্রিয়ার সুযোগও রাখা হয়েছে।

প্রস্তাবিত তালিকার বিষয়ে ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত মতামত নেওয়া হবে। এরপর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে প্রযুক্তি রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের তালিকা সংশোধন করা হতে পারে।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স, পিভি ম্যাগাজিন, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) এবং কাইসিন গ্লোবাল