বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনসংলগ্ন খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরায় গড়ে ওঠা ২৪টি রিসোর্ট বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। একই সঙ্গে এগুলোর স্থাপনা সরিয়ে নিতে বলা হয়েছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বন্ধের নির্দেশ পাওয়া রিসোর্টগুলোর মধ্যে খুলনায় ১৮টি, বাগেরহাটে দুটি এবং সাতক্ষীরায় রয়েছে চারটি। পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় (ইসিএ) প্রয়োজনীয় অনুমতি ছাড়া পরিচালনার অভিযোগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে আগে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের খুলনা বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক খোন্দকার মো. ফজলুল হক বলেন, আইন অনুযায়ী রিসোর্টগুলোর কর্তৃপক্ষকে নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। সন্তোষজনক জবাব না পাওয়ায় তাদের কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় কোনো রিসোর্ট পরিচালনা করা যায় না।
খুলনায় ১৮, বাগেরহাটে ২, সাতক্ষীরায় ৪
খুলনার দাকোপ উপজেলার সুন্দরবনসংলগ্ন ধাংমারী, কৈলাশগঞ্জ ও বানিশান্তা এলাকায় বন্ধের নির্দেশ পাওয়া ১৮টি রিসোর্ট হলো—অরণ্যছায়া, অরণ্যবাড়ী, কেওড়াবন, মায়াবন, গহন, দ্য ফরেস্ট রিট্রিট, নিকুঞ্জ ভ্যালি, লা সিলভা কটেজ, বনবিবি, সুন্দরী, ইরাবতী, বনমালী, গোলকানন, পিয়ালী, ম্যানগ্রোভ, জঙ্গলবাড়ী, বনবাস ও বনলতা ইকো কটেজ।
বাগেরহাটের দুটি রিসোর্ট হলো—টাইগার পয়েন্ট ও বাদাবন।
সাতক্ষীরার চারটি হলো—বর্ষা রিসোর্ট, সুশীলন রিসোর্ট, ওশান প্যারাডাইস এবং পরিষদ ও প্রাসাদ প্যারাডাইস।
পরিবেশ অধিদপ্তর জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট রিসোর্টগুলোর কার্যক্রম বন্ধের পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে স্থাপনা সরিয়ে নিতে হবে। নির্দেশনা না মানলে বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০) ও সংশ্লিষ্ট বিধিমালা অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এর মধ্যে খুলনার ১৮টি রিসোর্টকে গত ৪ অক্টোবর জেলা পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে আলাদা লিখিত নোটিশ দেওয়া হয়। এতে ১০টি প্রতিষ্ঠানকে ৩০ দিন এবং আটটিকে ১৫ দিনের মধ্যে স্থাপনা সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বনের বাইরে হলেও প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ
রিসোর্টগুলোর বেশির ভাগই সুন্দরবনের সীমানার বাইরে ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে গড়ে উঠেছে। ফলে এসব স্থাপনার ওপর বন বিভাগের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ সীমিত বলে জানিয়েছেন খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ।
তার ভাষ্য, রিসোর্টগুলোর কারণে বনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব বাড়ছে। পর্যটকদের কেউ কেউ অনুমতি ছাড়া বনে প্রবেশ করেন। এ ছাড়া অতিরিক্ত শব্দ ও আলো এবং পর্যটকদের ফেলে যাওয়া বর্জ্যও বন্যপ্রাণীর জন্য ক্ষতিকর।
সুন্দরবনের আশপাশে রিসোর্ট ও ইকো-কটেজের বিস্তার নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনা হয়েছে। গবেষণাসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, বনসংলগ্ন এলাকায় পর্যটন স্থাপনার সংখ্যা বাড়ছে।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার তথ্যমতে, ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ সুন্দরবনের চারপাশে ২০টি কটেজ নির্মিত হয়েছিল। এসব স্থাপনার পরিবেশগত প্রভাব এবং পরিচালনার ক্ষেত্রে নীতিমালার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।
পর্যটন ও পরিবেশের মধ্যে ভারসাম্যের প্রশ্ন
সুন্দরবনকে ঘিরে পর্যটনের প্রসার স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ তৈরি করলেও সংবেদনশীল এই প্রতিবেশব্যবস্থার ওপর এর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ করে শব্দ ও আলো, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পর্যটকদের চলাচল নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এ কারণে সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় পর্যটন স্থাপনা নির্মাণ ও পরিচালনার ক্ষেত্রে পরিবেশগত প্রভাব এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে পর্যটকদের চলাচল—সবকিছুর জন্য স্পষ্ট ও কার্যকর নীতিমালার প্রয়োজনীয়তার কথা উঠছে।
তবে রিসোর্ট মালিকদের সংগঠন ‘রিসোর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব সুন্দরবন’ পরিবেশ অধিদপ্তরের সিদ্ধান্তের সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করেছে। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া হোসাইন শাওনের দাবি, রিসোর্টগুলো সুন্দরবনের ভেতরে নয়, সংলগ্ন জনবসতিপূর্ণ এলাকায় গড়ে উঠেছে এবং এগুলোর সঙ্গে স্থানীয় পর্যটন ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড জড়িত।
তার মতে, এ খাত পুরোপুরি বন্ধ না করে পরিবেশ সুরক্ষা ও পর্যটনের মধ্যে সমন্বয় করে একটি স্পষ্ট নীতিমালা করা প্রয়োজন।
(প্রতিবেদনটি স্থানীয় প্রতিনিধির পাঠানো তথ্য নিয়ে তৈরি)