ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার উপস্থিতি ও বিস্তার পর্যবেক্ষণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি) প্রযুক্তিনির্ভর একটি স্বয়ংক্রিয় ফাঁদ তৈরি করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) একদল গবেষক। ‘এমএএসটি-ক্লাউডনেট’ নামের এই যন্ত্রটি স্ত্রী এডিস মশার ডানার শব্দ অনুকরণ করে পুরুষ মশা আকর্ষণ করে। এরপর ক্যামেরায় ধারণ করা ছবি এআইয়ের সাহায্যে বিশ্লেষণ করে মশার প্রজাতি শনাক্ত ও সংখ্যা গণনা করা হয়। সংগৃহীত তথ্য ইন্টারনেটের মাধ্যমে দূর থেকে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব।
ঢাবির তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের মাইক্রোসিস্টেমস অ্যান্ড ন্যানোইঞ্জিনিয়ারিং ল্যাব এবং প্রাণিবিদ্যা বিভাগের মুঈদ রিসার্চ গ্রুপের যৌথ উদ্যোগে যন্ত্রটি তৈরি করা হয়েছে। প্রাণিবিদ্যা বিভাগের মুঈদ রিসার্চ গ্রুপ ‘জিনোম-গাইডেড ভেক্টর কন্ট্রোল অ্যান্ড ইনোভেশন ল্যাব’ নামেও পরিচিত।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।
গবেষণায় নেতৃত্ব দিয়েছেন তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. সাইয়েদ মাহমুদ উল্লাহ এবং প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. খন্দকার আশফাকুল মুঈদ। দলের অন্য সদস্যরা হলেন—তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আহসান হাবীব, প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রভাষক আতিয়া সানজিদা শর্মী, তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের এ এম এম মুনিফ খান, ফাহাদ আরেফিন, আসিফ রহমান দীপ্ত ও আতিক বিন জাকির এবং প্রাণিবিদ্যা বিভাগের মো. সিয়াম সরকার ও নিলয় হাওলাদার।
‘এমএএসটি-ক্লাউডনেট: আইওটি-এনেবলড অ্যাকুস্টিক ট্র্যাপ উইথ রিয়েল-টাইম এআই সার্ভেইলেন্স অব এডিস’ (MAST-CloudNet: IoT-Enabled Acoustic Trap With Real-Time AI Surveillance of Aedes) শিরোনামের গবেষণাপত্রটি ৮ অক্টোবর আন্তর্জাতিক সাময়িকী ‘আইইইই ট্রানজ্যাকশনস অন ইনস্ট্রুমেন্টেশন অ্যান্ড মেজারমেন্ট’-এ (IEEE Transactions on Instrumentation and Measurement) প্রকাশিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা তহবিলের অর্থায়নে গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে।
শব্দ ও এআই প্রযুক্তিতে যেভাবে কাজ করে ফাঁদ
গবেষকেরা মশার স্বাভাবিক জৈবিক আচরণকে কাজে লাগিয়ে ফাঁদটি তৈরি করেছেন। উড়ন্ত স্ত্রী এডিস মশার ডানার কম্পন থেকে তৈরি শব্দ অনুকরণ করে যন্ত্রটি ৩৫০ থেকে ৫০০ হার্জ কম্পাঙ্কের শব্দতরঙ্গ তৈরি করে। এতে আকৃষ্ট হয়ে পুরুষ এডিস মশা ফাঁদের কাছে এলে ভেতরে থাকা পাখার টানে সেগুলো হলুদ আঠালো কাগজে আটকে যায়।
এরপর ফাঁদের ক্যামেরা আটকে পড়া মশার ছবি তোলে। ইন্টারনেটের মাধ্যমে ছবিগুলো ক্লাউড সার্ভারে পাঠানো হয়। সেখানে থাকা এআই মডেল ছবি বিশ্লেষণ করে মশার প্রজাতি শনাক্ত ও সংখ্যা গণনা করে। এসব তথ্য ওয়েবভিত্তিক ড্যাশবোর্ডে দেখা যায়।
এ ব্যবস্থায় বারবার ফাঁদ পরীক্ষা করতে মাঠপর্যায়ে যাওয়ার প্রয়োজন কমতে পারে। একই সঙ্গে একাধিক ফাঁদ থেকে সংগৃহীত তথ্য কেন্দ্রীয়ভাবে বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন এলাকার এডিস মশার উপস্থিতি ও সংখ্যার পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হতে পারে।
পুরুষ মশার উপস্থিতি কেন গুরুত্বপূর্ণ
সাধারণত মানুষকে কামড়ায় স্ত্রী এডিস মশা; পুরুষ মশা নয়। তবে পুরুষ এডিস মশার উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে কোনো এলাকায় এডিস মশার বিস্তার সম্পর্কে আগাম ধারণা পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
গবেষকদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, পুরুষ মশা স্ত্রী মশার আগে পূর্ণবয়স্ক হয় এবং প্রজননস্থলের কাছাকাছি অবস্থান করতে পারে। ফলে কোনো এলাকায় পুরুষ এডিস মশার সংখ্যা বাড়তে থাকলে সেখানে মশার উপস্থিতি বা সম্ভাব্য বিস্তার সম্পর্কে আগাম সতর্কসংকেত পাওয়া যেতে পারে।
তবে পুরুষ মশার সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেই নতুন করে বংশবিস্তার হচ্ছে বা ওই এলাকায় ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব ঘটবে—এমন সিদ্ধান্ত নিশ্চিতভাবে দেওয়া যায় না। ডেঙ্গুর ঝুঁকি নিরূপণে মশার উপস্থিতির পাশাপাশি রোগের সংক্রমণ পরিস্থিতিসহ অন্যান্য তথ্যও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। এ প্রযুক্তির মাধ্যমে ডেঙ্গুর ঝুঁকি মূল্যায়নে সহায়ক তথ্য পাওয়া যেতে পারে; রোগের প্রাদুর্ভাব আগাম অনুমান করার সক্ষমতা প্রতিষ্ঠায় আরও মাঠপর্যায়ের পরীক্ষা প্রয়োজন।
পরীক্ষায় কী ফল মিলেছে
গবেষণাগারের নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষায় শব্দযুক্ত ফাঁদে এডিস মশা ধরার হার ছিল ৮৩ দশমিক ৩ শতাংশ। একই পরীক্ষায় শব্দহীন নিয়ন্ত্রণ ফাঁদের ক্ষেত্রে এ হার ছিল ৫০ শতাংশ। এ দুটি ফলের ভিত্তিতে ফাঁদটির কার্যকারিতা তুলনা করা গেলেও পরিমাপের পদ্ধতি ও পরীক্ষার শর্ত বিবেচনা না করে ফলাফলকে সব পরিস্থিতির জন্য প্রযোজ্য ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
এরপর ঢাবি ক্যাম্পাসের খোলা জায়গায় টানা তিন দিন যন্ত্রটির প্রাথমিক মাঠপরীক্ষা চালানো হয়। গবেষণাগারের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এ সময় শব্দযুক্ত ফাঁদে ৪৯টি এডিস ও ১০টি অন্য প্রজাতির মশা ধরা পড়ে। অন্যদিকে শব্দহীন নিয়ন্ত্রণ ফাঁদে একটি এডিস ও তিনটি অন্য প্রজাতির মশা ধরা পড়ে।
পরীক্ষার সময় ভারী বৃষ্টিপাত, ঝোড়ো বাতাস ও শহুরে কোলাহলের মধ্যেও যন্ত্রটি সচল ছিল বলে গবেষকেরা জানিয়েছেন। তবে তিন দিনের এই পরীক্ষা প্রাথমিক পর্যায়ের। বিভিন্ন আবাসিক এলাকা ও দীর্ঘ সময় ধরে যন্ত্রটির কার্যকারিতা যাচাই করা প্রয়োজন।
নির্মাণব্যয় ও ব্যবহারিক সম্ভাবনা
গবেষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, একটি ফাঁদ তৈরিতে খরচ হয়েছে প্রায় ১২ হাজার টাকা। তুলনায় প্রচলিত সিডিসি লাইট ট্র্যাপের দাম প্রায় ২৫ হাজার টাকা এবং বিজি-সেন্টিনেল ট্র্যাপের দাম প্রায় ২০ হাজার টাকা।
কেন্দ্রীয় সার্ভারের মাধ্যমে একসঙ্গে অনেক ফাঁদের তথ্য বিশ্লেষণ করা গেলে বড় পরিসরে ব্যবহারের ক্ষেত্রে পর্যবেক্ষণ ব্যয় কমতে পারে। বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলে ব্যাকআপ ব্যাটারির সাহায্যে যন্ত্রটি প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা সচল থাকতে পারে বলেও গবেষকেরা জানিয়েছেন।
আবাসিক এলাকায় পরীক্ষার পরিকল্পনা
গবেষণাগার ও বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রাথমিক পরীক্ষার পর প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা আরও যাচাই করতে বড় পরিসরে মাঠপর্যায়ের পরীক্ষা চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এ লক্ষ্যে ২০২৭ সালের জুন-জুলাইয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় ১০ থেকে ১৫টি ফাঁদ বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এসব ফাঁদ থেকে সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এডিস মশার উপস্থিতি ও সংখ্যার পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ এবং সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার একটি মানচিত্র তৈরির লক্ষ্য রয়েছে।
ভবিষ্যতে যন্ত্রটিকে সৌরশক্তিচালিত করার পাশাপাশি ওয়াই-ফাইয়ের ওপর নির্ভরতা কমাতে দীর্ঘপাল্লার বেতার যোগাযোগ প্রযুক্তি ‘লোরাওয়ান’ যুক্ত করার কাজ চলছে। একই সঙ্গে রোদ-বৃষ্টি সহনশীল করে যন্ত্রটির স্থায়িত্ব বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
উপাচার্যের অভিনন্দন
ঢাবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম এডিস মশা শনাক্তের প্রযুক্তি উদ্ভাবনের জন্য গবেষক দলকে অভিনন্দন জানিয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে তিনি বলেন, কোন কোন এলাকায় ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার ঘনত্ব বাড়ছে, তা আগেভাগে জানা গেলে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে। এ ক্ষেত্রে যন্ত্রটি সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি প্রযুক্তিটির আরও উন্নয়ন ও কার্যকর ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। পাশাপাশি মানুষের জীবনমান উন্নয়নে জীবনঘনিষ্ঠ ও প্রায়োগিক গবেষণায় আরও মনোযোগী হওয়ার জন্য গবেষকদের প্রতি আহ্বান জানান।