ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপের বাংকা-বেলিতুং প্রদেশে দাবানলে অন্তত ৩০০টি বাড়ি পুড়ে গেছে। আগুন থেকে বাঁচতে গ্রাম ছেড়েছে কমপক্ষে ১ হাজার মানুষ। স্থানীয় এক কর্মকর্তার বরাতে মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) এ তথ্য জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান।
দক্ষিণ বাংকা জেলার প্রধান রিজা হারদেভিদের ভাষ্য, গত শনিবার (১০ অক্টোবর) গ্রামটির দিকে আগুন এগিয়ে আসতে দেখে বাসিন্দারা বহনযোগ্য পানির পাম্প দিয়ে তা নেভানোর চেষ্টা করেন। পরে আগুন নিয়ন্ত্রণে এসেছে বলে মনে করা হলেও পিটভূমির মাটির নিচে আগুন জ্বলছিল। বাতাসের দিক পরিবর্তনের পর সেই আগুন দ্রুত জনবসতিতে ছড়িয়ে পড়ে।
রিজা হারদেভিদ বলেন, বাসিন্দারা ভেবেছিলেন আগুন নিভে গেছে। কিন্তু পিটভূমির নিচে আগুন ধিকিধিকি জ্বলছিল। বাতাসের দিক পরিবর্তনের পর আগুন দ্রুত বসতির দিকে ছড়িয়ে পড়ে।
দাবানলে ক্ষতিগ্রস্তদের একজন ৫৫ বছর বয়সী লেনি। আশ্রয়কেন্দ্রে পরিবারের সঙ্গে থাকা এই নারী গার্ডিয়ানকে বলেন, তার বাড়ি পুড়ে গেছে। সন্তানদের নিয়ে প্রাণ বাঁচিয়ে বেরিয়ে আসতে পেরেছেন তিনি। আতঙ্কের কারণে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নেওয়ার সময়ও পাননি।
আরেক বাসিন্দা ৫০ বছর বয়সী হারিয়ানতি বলেন, প্রবল বাতাসে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কাঠের তৈরি বাড়িগুলো আগুনে পুড়ে যায়। জীবন বাঁচাতে দ্রুত পালিয়ে যান তিনি। কোনো জিনিসপত্রই রক্ষা করতে পারেননি; গায়ের কাপড়টুকুই শুধু ছিল।
পিটভূমিতে আগুনের ঝুঁকি
রিজা হারদেভিদের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রামটি আগে সংরক্ষিত এলাকার পিটভূমির অংশ ছিল। গত বছর ওই এলাকায় আবাসন গড়ে তোলা হয়।
পিটভূমিতে উদ্ভিদ ও অন্যান্য জৈব পদার্থ জমে তৈরি হয় জৈবসমৃদ্ধ মাটি। এ মাটির নিচে আগুন ছড়িয়ে পড়লে তা শনাক্ত করা ও পুরোপুরি নেভানো কঠিন হয়ে পড়ে। ওপরের আগুন নিভে গেলেও মাটির নিচে আগুন জ্বলতে পারে। পরে বাতাস ও শুষ্ক আবহাওয়ার অনুকূল পরিস্থিতিতে সেই আগুন আবার ছড়িয়ে পড়তে পারে।
এল নিনো ও দাবানলের বিস্তার
ইন্দোনেশিয়ায় শুষ্ক মৌসুমে প্রায়ই বন ও ভূমিতে আগুন লাগে। তবে চলতি বছর দাবানল আরও তীব্র হয়েছে। এর পেছনে এল নিনোর প্রভাব রয়েছে বলে গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, গত চার দশকের মধ্যেে এবার অন্যতম শক্তিশালী এল নিনো হতে পারে।
এল নিনো মূলত একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুপ্রক্রিয়া, যা প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলের তাপমাত্রা ও বায়ুমণ্ডলীয় পরিবর্তন থেকে সৃষ্টি হয়। এর প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার ধরন বদলে যেতে পারে। ইন্দোনেশিয়ায় শুষ্কতা বাড়লে বন ও ভূমিতে আগুন ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়।
বিশেষজ্ঞরা বন উজাড় এবং জমি পরিষ্কারের জন্য গাছপালা পুড়িয়ে ফেলার চর্চাকেও দাবানলের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এসব কর্মকাণ্ড সুমাত্রা ও বোর্নিও দ্বীপের প্রাকৃতিক পরিবেশের পরিবর্তন ঘটিয়েছে এবং আগুনের ঝুঁকি বাড়িয়েছে।
ধোঁয়ায় বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি
চলতি বছরের দাবানলে ইন্দোনেশিয়ার বিভিন্ন এলাকায় ঘন ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়েছে। দাবানলের ধোঁয়া থেকে সৃষ্ট বায়ুদূষণের প্রভাব প্রতিবেশী সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়াতেও দেখা গেছে।
বোর্নিও দ্বীপের একটি প্রদেশে ঘন ধোঁয়ার কারণে আগুন নেভানোর কাজে পানি ছিটানোর উড়োজাহাজের কার্যক্রমও ব্যাহত হয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা।
এদিকে, বিভিন্ন এলাকায় কয়েক মাস ধরে চলা দাবানল নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো। সোমবার সরকারের এ নির্দেশের কথা জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব টেডি ইন্দ্রা উইজায়া। তিনি বলেন, দাবানল মোকাবিলায় মাঠপর্যায়ে ৬০ হাজারের বেশি কর্মী মোতায়েন করা হয়েছে।
বন ও ভূমির আগুনে ইন্দোনেশিয়ায় বসতবাড়ি ও মানুষের জীবিকার ক্ষতির পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য ও আঞ্চলিক বায়ুমানও হুমকির মুখে পড়েছে। শুষ্ক আবহাওয়া, এল নিনোর প্রভাব এবং ভূমি ব্যবহারের ধরন—সব মিলিয়ে এ বছর দাবানল নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জ আরও বেড়েছে।