জলবায়ু পরিবর্তনের বিপর্যয়কর প্রভাব এড়াতে বিশ্বকে আগামী চার বছরে গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এবং আগামী এক দশকে প্রায় অর্ধেক কমাতে হবে। তা না হলে বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যমাত্রা বিপজ্জনক মাত্রায় ছাড়িয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
জাতিসংঘের পরিবেশবিষয়ক সংস্থা ইউএন এনভায়রনমেন্ট প্রোগ্রামের (ইউএনইপি) ‘ইমিশন্স গ্যাপ রিপোর্ট ২০২৬: দ্য পয়েন্ট অব রিটার্ন’ (Emissions Gap Report 2026: The Point of Return) শীর্ষক প্রতিবেদনে এ সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। বুধবার (২১ অক্টোবর) এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান।
ইউএনইপির মতে, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি প্রাক্-শিল্পায়ন যুগের তুলনায় ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমিত রাখার সুযোগ কার্যত শেষ হয়ে গেছে। তবে এই সীমা কতটা ছাড়াবে এবং কত দিন ছাড়িয়ে থাকবে, তা সীমিত রাখার সুযোগ এখনো রয়েছে। নির্দিষ্ট একটি পরিস্থিতিতে শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে উষ্ণতা বৃদ্ধির সর্বোচ্চ মাত্রা ১ দশমিক ৭ থেকে ১ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমিত রাখা গেলে শতাব্দীর শেষ নাগাদ তাপমাত্রা আবার ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে বা তার নিচে ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা প্রায় ৫০ শতাংশ।
‘নিঃসরণ ঘাটতি’ নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমানোর দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নির্ধারণ করলেও দেশগুলো সেই অনুযায়ী স্বল্পমেয়াদি কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারছে না। ফলে জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে বাস্তব নীতি ও পদক্ষেপের ব্যবধান বাড়ছে।
২০২৫ সালে বিশ্বে কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ আগের বছরের কাছাকাছি ছিল। এতে নিঃসরণ বৃদ্ধি আপাতত থেমে গেছে বলে মনে হতে পারে। তবে একে নিঃসরণের সর্বোচ্চ পর্যায় বা স্থিতিশীল অবস্থা হিসেবে দেখতে সতর্ক করেছেন ইউএনইপির বিশ্লেষকেরা। তাদের মতে, ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির দ্রুত প্রসার সত্ত্বেও জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা পরিস্থিতিকে অনিশ্চিত করে তুলেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির সর্বোচ্চ মাত্রা প্রাক্-শিল্পায়ন যুগের তুলনায় ১ দশমিক ৭ থেকে ১ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমিত রেখে শতাব্দীর শেষ নাগাদ আবার ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা তৈরি করতে হলে ২০২৫ সালের তুলনায় ২০৩০ সালের মধ্যে গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ ১৮ শতাংশ, ২০৩৫ সালের মধ্যে ৪৫ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৬৯ শতাংশ কমাতে হবে।
তবে উষ্ণতা বৃদ্ধির সর্বোচ্চ মাত্রা ১ দশমিক ৭ থেকে ১ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমিত রাখা গেলেও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দেখা যাওয়া রেকর্ড তাপপ্রবাহের মতো ঘটনা ঘন ঘন ঘটতে পারে। তবু জলবায়ুর চরম পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠার ঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে।
সময় থাকতে পদক্ষেপ নেয়নি বিশ্ব
ইউএনইপির নির্বাহী পরিচালক ইঙ্গার অ্যান্ডারসেন বলেন, সময় ফুরিয়ে আসার বিষয়ে সরকারগুলোকে বহু বছর ধরে সতর্ক করা হয়েছে। কিন্তু ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সীমার মধ্যে উষ্ণতা ধরে রাখতে প্রয়োজনীয় বড় ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, ‘আমরা আগে বলতাম, অসাধারণ মাত্রার প্রচেষ্টা চালাতে পারলে এখনো ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সীমার মধ্যে থাকার সুযোগ আছে। এখন স্পষ্ট যে সেই অসাধারণ প্রচেষ্টা চালানো হয়নি। আমরা সময়ক্ষেপণ করেছি, আর এখন বলতে হচ্ছে—সেই সুযোগের সময়সীমা শেষ হয়ে গেছে।’
তবে প্যারিস জলবায়ু চুক্তির কেন্দ্রীয় লক্ষ্য ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সীমা ধরে রাখার আহ্বান জানিয়েছেন অ্যান্ডারসেন। তাঁর মতে, এই সীমা ছাড়িয়ে গেলেও সেই পরিস্থিতি যতটা সম্ভব স্বল্পস্থায়ী ও সীমিত রাখা যেতে পারে।
অ্যান্ডারসেন বলেন, ‘হাল ছেড়ে দেওয়ার বা আশা ত্যাগ করার সময় এখনো আসেনি। যতটা সম্ভব কম সময়ে কীভাবে আবার লক্ষ্যে ফিরে আসা যায়, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন।’
যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা
চীনের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণকারী দেশ যুক্তরাষ্ট্র। ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে দেশটি প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে সরে গেছে। একই সঙ্গে দেশটিতে দীর্ঘদিন ধরে চলা গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমার ধারাও উল্টে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
জলবায়ুবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্লাইমেট অ্যানালিটিকসের প্রধান নির্বাহী বিল হেয়ার বলেন, সব দেশের সরকারেরই পদক্ষেপ নেওয়ার দায়িত্ব রয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের মতো বড় জীবাশ্ম জ্বালানি উৎপাদনকারী দেশগুলোর দায়িত্ব বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বে মোট জীবাশ্ম জ্বালানির ২০ থেকে ২৫ শতাংশ উৎপাদন করে এই দুই দেশ।
হেয়ার বলেন, ‘রাজনীতি নিয়ে খেলা বন্ধ করে বৈজ্ঞানিক বাস্তবতা মেনে নেওয়ার সময় এসেছে। এখন তারা আগুনের দিকে তাকিয়ে বলছে, আগুন বলে কিছু নেই; অথচ তাতেই আরও জ্বালানি ঢালছে। এদিকে তাদের নিজেদের নাগরিকেরাও তীব্র তাপ, দাবানল ও অন্যান্য জলবায়ুজনিত প্রভাবের মুখে পড়ছেন।’
যুক্তরাষ্ট্রের অনড় অবস্থানের প্রভাব অন্য দেশগুলোর ওপরও পড়েছে বলে মনে করছে ইউএনইপি। সংস্থাটির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গত বছর দেশগুলোর দেওয়া গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমানোর প্রতিশ্রুতিগুলো ছিল উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল।
২০২৫ সালের নভেম্বরে ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত কপ৩০ জলবায়ু সম্মেলনে প্যারিস চুক্তির আওতায় দেশগুলোর নিঃসরণ কমানোর নতুন অঙ্গীকার দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সম্মেলনে দেওয়া অঙ্গীকারগুলো নিঃসরণ কমানোর জন্য প্রয়োজনীয় মাত্রার তুলনায় অনেক দুর্বল ছিল।
বর্তমান নীতিতে উষ্ণতা বাড়তে পারে ২.৮ ডিগ্রি
দেশগুলোর হালনাগাদ প্রতিশ্রুতি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলেও বৈশ্বিক তাপমাত্রা প্রাক্-শিল্পায়ন যুগের তুলনায় ২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়তে পারে বলে ইউএনইপির পূর্বাভাস। এতে বিশ্বের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপর গুরুতর হুমকি তৈরি হবে।
অন্যদিকে, বিশ্বজুড়ে বর্তমানে কার্যকর নীতিগুলো অপরিবর্তিত থাকলে তাপমাত্রা বৃদ্ধির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ২ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে।
দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমান মাত্রায় গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ আরও প্রতি পাঁচ বছর অব্যাহত থাকলে বৈশ্বিক উষ্ণতার সম্ভাব্য সর্বোচ্চ মাত্রার পূর্বাভাস প্রায় শূন্য দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস করে বেড়ে যায়। বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, তাপমাত্রা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সীমা যত বেশি ছাড়াবে, জলবায়ুব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলোর অপরিবর্তনীয় পরিবর্তন বা ‘টিপিং পয়েন্ট’ অতিক্রমের ঝুঁকিও তত বাড়বে।
আফ্রিকার জ্বালানি রূপান্তর নিয়ে কাজ করা গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার শিফট আফ্রিকার পরিচালক মোহামেদ আদো বলেন, জলবায়ু সংকট মোকাবিলার সমাধান মানুষের হাতের নাগালেই রয়েছে। সৌর ও বায়ুশক্তির ব্যবহার প্রত্যাশার চেয়েও দ্রুত বাড়ছে। তারপরও সরকারগুলো জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে প্রয়োজনীয় গতিতে সরে আসতে ব্যর্থ হচ্ছে।
আদোর ভাষায়, ‘প্রযুক্তি দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে, অথচ রাজনৈতিক নেতৃত্ব পিছিয়ে থাকছে।’
জলবায়ু মূল্যায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা
দেশগুলোর নিঃসরণ কমানোর প্রতিশ্রুতির ঘাটতি পূরণের জন্য প্যারিস চুক্তিতে ‘গ্লোবাল স্টকটেক’ নামে একটি ব্যবস্থা রয়েছে। এর আওতায় জলবায়ু লক্ষ্য অর্জনে বিশ্ব কতটা এগিয়েছে, তা মূল্যায়ন করা হয়। পরবর্তী মূল্যায়ন ২০২৮ সালে হওয়ার কথা।
তবে এই প্রক্রিয়াও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। চলতি সপ্তাহে জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক আন্তসরকার প্যানেল (আইপিসিসি) তাদের পরবর্তী প্রতিবেদন প্রকাশের সময়সূচি নির্ধারণ করতে পারেনি। ফলে ২০২৮ সালের বৈশ্বিক মূল্যায়নের আগে সরকারগুলো সর্বশেষ বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে নিজেদের অগ্রগতি পর্যালোচনার সুযোগ নাও পেতে পারে।
তবে আইপিসিসির প্রতিবেদন প্রকাশের সময় নিয়ে মতবিরোধ যেন সরকারগুলোর পদক্ষেপে বাধা না হয়, সে আহ্বান জানিয়েছেন পটসডাম ইনস্টিটিউট ফর ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট রিসার্চের পরিচালক ও জলবায়ুবিজ্ঞানী ইয়োহান রকস্ট্রম।
তিনি বলেন, বর্তমান জাতীয় অঙ্গীকারগুলো বাস্তবায়িত হলেও ২০৩৫ সালে বিশ্বে বছরে প্রায় ৫০ গিগাটন কার্বন ডাই-অক্সাইড সমতুল্য গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ হতে পারে। অথচ ওই সময়ের মধ্যে তা ৩৫ গিগাটনের নিচে নামানো প্রয়োজন।
রকস্ট্রম বলেন, ‘বিজ্ঞান ইতিমধ্যে বিষয়টি স্পষ্ট করেছে। এই ঘাটতি পূরণ করা বৈজ্ঞানিক প্রমাণের অভাবের বিষয় নয়, বরং রাজনৈতিক পদক্ষেপের বিষয়।’
দ্রুত উষ্ণতা বৃদ্ধি সীমিত করার একটি উপায় হিসেবে মিথেনের নিঃসরণ কমানোর কথা বলেছে ইউএনইপি। ২০ বছরের সময়সীমায় একই পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইডের তুলনায় মিথেনের উষ্ণায়ন-প্রভাব প্রায় ৮০ গুণ বেশি।