বিজ্ঞাপন

বিশ্ব প্রাণী দিবসের ২০২৬ প্রতিপাদ্য কী বলছে

WAD1.jpg
প্রাণীদের দৃষ্টিকোণ থেকে পৃথিবীকে দেখার আহ্বান জানাচ্ছে ২০২৬ সালের বিশ্ব প্রাণী দিবসের প্রতিপাদ্য। ছবি: ওয়ার্ল্ড অ্যানিমেল ডে

একটি পাখির জন্য হারিয়ে যাওয়া গাছ মানে শুধু একটি গাছ হারানো নয়, একটি আশ্রয় হারানো। বন্যপ্রাণীর জন্য কেটে ফেলা বন মানে সংকুচিত হয়ে আসা বিচরণক্ষেত্র। আর শহরের পথপ্রাণীর কাছে ব্যস্ত সড়ক, খাবারের সংকট আর মানুষের নিষ্ঠুরতাই নিত্যদিনের লড়াই। সেই প্রাণীদের অবস্থান থেকে পৃথিবীকে দেখার আহ্বানই এবারের ‘বিশ্ব প্রাণী দিবসের’ প্রতিপাদ্য।

প্রতিবছর ৪ অক্টোবর বিশ্বজুড়ে পালিত হয় বিশ্ব প্রাণী দিবস। প্রাণীর কল্যাণ ও সুরক্ষা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং প্রাণীদের প্রতি মানুষের দায়িত্ব নিয়ে সচেতনতা বাড়ানো দিবসটির অন্যতম উদ্দেশ্য।

২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য: ‘তাদের চোখে পৃথিবীকে দেখুন’

২০২৬ সালের বিশ্ব প্রাণী দিবসের প্রতিপাদ্য ‘সি দ্য ওয়ার্ল্ড থ্রু দেয়ার আইজ’, বাংলায় ‘তাদের চোখে পৃথিবীকে দেখুন’। দিবসটির বৈশ্বিক সমন্বয়ের সঙ্গে যুক্ত যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রাণীকল্যাণ সংস্থা ‘নেচারওয়াচ ফাউন্ডেশন’ গত ১৯ মার্চ প্রতিপাদ্যটি ঘোষণা করে। 

এবারের বিশ্ব প্রাণী দিবসের প্রতিপাদ্য। ছবি: ওয়ার্ল্ড অ্যানিমেল ডে 

প্রতিপাদ্যটি মানুষকে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ভাবার কথা বলে। আমরা যে বনকে উন্নয়নের জমি হিসেবে দেখি, সেটিই হয়তো কোনো প্রাণীর প্রজন্মের পর প্রজন্মের আবাস। যে জলাশয়কে ভরাটের জায়গা ভাবা হয়, সেটিই হতে পারে অসংখ্য প্রাণীর খাদ্য ও আশ্রয়ের প্রধান উৎস।

একটি সমাবেশ থেকে বৈশ্বিক আন্দোলন

বিশ্ব প্রাণী দিবসের ধারণার পেছনে ছিলেন হাইনরিখ জিমারম্যান (১৮৮৭–১৯৪২)। পোল্যান্ডের ওয়ারশে জন্ম নেওয়া এই সাংবাদিক, লেখক ও প্রাণীকল্যাণকর্মী পরে জার্মানির বার্লিনে বসবাস শুরু করেন। তিনি ছিলেন পাক্ষিক পত্রিকা ‘মেনশ উন্ট হুন্ড’ (মানুষ ও কুকুর)-এর প্রকাশক এবং এই পত্রিকার মাধ্যমেই সাধারণ মানুষের কাছে প্রাণীকল্যাণের বার্তা পৌঁছে দিতেন। দিবসটির জন্য তিনি একটি কমিটিও গঠন করেছিলেন।

১৯২৫ সালের ২৪ মার্চ বার্লিনের স্পোর্ট প্যালেসে জিমারম্যানের উদ্যোগে প্রথম প্রাণী দিবস পালিত হয়। ওয়ার্ল্ড অ্যানিমেল ডে-র তথ্যমতে, সেখানে পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ অংশ নেন। পরিকল্পনা ছিল ৪ অক্টোবর দিবসটি আয়োজন করার। কিন্তু হাজার হাজার দর্শক ধারণ করতে সক্ষম একমাত্র বড় ভেন্যু স্পোর্ট প্যালেস সেদিন পাওয়া যায়নি। তাই আয়োজনটি হয় মার্চে। পরের কয়েক বছর মার্চেই দিবসটি পালিত হয় এবং ১৯২৯ সালে প্রথমবারের মতো ৪ অক্টোবর দিনটি পালন করা হয়। শুরুতে দিবসটির অনুসারী ছিল মূলত জার্মানি, অস্ট্রিয়া, সুইজারল্যান্ড ও চেকোস্লোভাকিয়ায়।

অবশেষে ১৯৩১ সালের ৮ মে ইতালির ফ্লোরেন্সে আন্তর্জাতিক প্রাণী সুরক্ষা কংগ্রেসে জিমারম্যানের প্রস্তাবে ৪ অক্টোবরকে বিশ্বব্যাপী প্রাণী দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়।

 প্রচলিত ভুল ধারণা

> অনেক জায়গায় লেখা হয়, ১৯৩১ সালে পরিবেশবিদদের এক সম্মেলনে দিবসটি গৃহীত হয়েছিল এবং এর উদ্দেশ্য ছিল বিপন্ন প্রজাতির দুর্দশা তুলে ধরা। আসলে ফ্লোরেন্সের সভাটি ছিল প্রাণী সুরক্ষা সংগঠনগুলোর আন্তর্জাতিক কংগ্রেস, এবং দিনটি বেছে নিয়েছিল তারাই। 

৪ অক্টোবর বেছে নেওয়ার সঙ্গে আছে আরেকটি ঐতিহাসিক যোগসূত্র। দিনটি সেন্ট ফ্রান্সিস অব আসিসির (১১৮১–১২২৬) স্মরণদিবস, যিনি প্রাণী ও প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসার জন্য পরিচিত। প্রচলিত কাহিনিতে আছে, তিনি প্রাণীদের সঙ্গে কথা বলতে পারতেন। আসিসি ফ্লোরেন্স থেকে মাত্র দুই ঘণ্টার দূরত্বে, আর ফ্রান্সিসের মৃত্যুর ৭০৫ বছর পর ফ্লোরেন্সে দিবসটি আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়। ২০২৫ সালে দিবসটির প্রথম আয়োজনের একশো বছর পূর্ণ হয়েছে।

নেচারওয়াচ ফাউন্ডেশনের ভূমিকা

সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে দিবসটি একটি নির্দিষ্ট আয়োজনের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক প্রাণীকল্যাণ আন্দোলনের অংশ হয়ে উঠেছে। নেচারওয়াচ ফাউন্ডেশন ২০০৩ সালে ওয়ার্ল্ড অ্যানিমেল ডে-র অফিসিয়াল ওয়েবসাইট চালু করে এবং ২০০৭ সালে শুরু করে ‘অ্যাম্বাসেডর প্রোগ্রাম’। বর্তমানে ৭৪টি দেশে ৯০ জনের বেশি অ্যাম্বাসেডর স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা তৈরিতে কাজ করছেন।

সংকটে প্রাণী ও বাস্তুতন্ত্র

সকালের ব্যস্ত শহরে রাস্তার পাশে থাকা একটি কুকুর বা বিড়াল আমাদের চোখে খুব সাধারণ দৃশ্য। অথচ খাবার, নিরাপদ আশ্রয় আর চিকিৎসার অভাবে সেই প্রাণীর জীবন নিত্যই অনিশ্চিত। বনের প্রাণীদের সংকট আরও গভীর। তাদের আবাস কমছে, খাদ্যের উৎস বদলে যাচ্ছে এবং মানুষের সঙ্গে সংঘাত বাড়ছে।

  • আবাসস্থল ধ্বংস: বন উজাড় ও প্রাকৃতিক আবাস সংকুচিত হওয়ায় বন্যপ্রাণী স্বাভাবিক বিচরণক্ষেত্র হারাচ্ছে।
  • জলবায়ু পরিবর্তন, দূষণ ও অবৈধ বাণিজ্য: জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ দূষণ, অবৈধ শিকার এবং বন্যপ্রাণীর অবৈধ বাণিজ্য অনেক প্রজাতির অস্তিত্বের জন্য হুমকি।
  • পথপ্রাণীর প্রতি অবহেলা: পথপ্রাণী ও গৃহপালিত প্রাণীর ওপর নির্যাতন, অবহেলা ও নিষ্ঠুর আচরণ প্রাণীকল্যাণের বড় উদ্বেগ।

প্রাণী সুরক্ষার প্রশ্নটি তাই কেবল নৈতিকতার নয়। একটি বন শুধু গাছের সমষ্টি নয়; সেখানে অসংখ্য প্রাণী, উদ্ভিদ ও অণুজীব পরস্পরের ওপর নির্ভর করে বাঁচে। একটি প্রজাতি কমে গেলে বা হারিয়ে গেলে তার প্রভাব পড়ে অন্য প্রাণী ও উদ্ভিদের ওপর। তাই একটি প্রাণীকে বাঁচানো মানে অনেক ক্ষেত্রে তার আবাস, খাদ্যশৃঙ্খল এবং পুরো বাস্তুতন্ত্রকেও বাঁচিয়ে রাখা। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের নিজের ভবিষ্যৎও।

একেক দেশে একেক আয়োজন, লক্ষ্য একই

আয়োজনের ধরন দেশভেদে আলাদা:

  • চিকিৎসা ও সেবা: পথপ্রাণী ও অসুস্থ প্রাণীর জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসা ও টিকাদান।
  • দত্তক: গৃহহীন প্রাণীর নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ‘পেট অ্যাডাপশন’বা দত্তক নেওয়ার কর্মসূচি।
  • সচেতনতা: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা সভা ও প্রচারাভিযান।

কর্মসূচির ধরন আলাদা হলেও উদ্দেশ্য এক: প্রাণীদের প্রতি মানুষের আচরণে দায়িত্বশীলতা ও সহমর্মিতা বাড়ানো।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট

প্রতিপাদ্যের প্রশ্নটি বাংলাদেশের জন্যও সমান প্রাসঙ্গিক। নদী, হাওড়, জলাভূমি, উপকূল ও সুন্দরবন—এসব শুধু মানুষের জীবন ও জীবিকার অংশ নয়, অসংখ্য প্রাণীরও আবাস। কোনো জলাভূমি ভরাট হলে শুধু পানি ধারণের জায়গা হারায় না; সংকুচিত হয় পাখি, মাছ, উভচর ও জলজ প্রাণীর আবাস। নদী-খাল দূষিত হলে তার প্রভাব পড়ে সেই জলাধারের ওপর নির্ভরশীল প্রাণীদের খাদ্য ও জীবনচক্রে।

বন উজাড় বা আবাসস্থলে মানুষের চাপ বাড়লে সংকুচিত হয় বন্যপ্রাণীর বিচরণক্ষেত্র। শুশুক, ঘড়িয়াল, পরিযায়ী পাখি কিংবা সুন্দরবনের বাঘ—প্রতিটি প্রাণীর অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নির্দিষ্ট আবাস ও খাদ্যব্যবস্থা। সেই আবাসের পরিবর্তন তাদের জীবনেও পরিবর্তন আনে।

মানুষের চোখে হয়তো একটি নদী সেচ, নৌযান বা অর্থনীতির অংশ। কিন্তু কোনো জলজ প্রাণীর কাছে সেটিই তার পুরো পৃথিবী। কোনো বন মানুষের কাছে কাঠ বা জমির উৎস হতে পারে; একটি বন্যপ্রাণীর কাছে সেটিই তার ঘর।

প্রাণী রক্ষায় আমাদের করণীয়

প্রাণী সুরক্ষায় সবসময় বড় উদ্যোগ লাগে না। দৈনন্দিন জীবনের ছোট আচরণও পার্থক্য গড়ে দিতে পারে:

  • আশপাশের প্রাণীর প্রতি সহমর্মী হওয়া এবং অযথা আঘাত না করা।
  • বন্যপ্রাণীকে পোষ মানাতে ধরে না আনা বা খাঁচায় বন্দি না রাখা।
  • বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক আবাস রক্ষায় সচেতন থাকা।
  • বন্যপ্রাণী শিকার ও অবৈধ কেনাবেচার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া।
  • প্রাণীকল্যাণ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণসংক্রান্ত আইন মেনে চলা।

এখন প্রশ্নটা শুধু এই নয় যে আমরা প্রাণীদের কতটা রক্ষা করতে পারি; প্রশ্ন হলো, তাদের সঙ্গে পৃথিবীটা কতটা ভাগ করে নিতে পারি। আমাদের সিদ্ধান্ত, উন্নয়ন আর দৈনন্দিন আচরণ অন্য প্রাণীদের জীবনে কী প্রভাব ফেলছে, তা একবার তাদের দৃষ্টিকোণ থেকেও দেখা—এটাই এবারের প্রতিপাদ্যের আহ্বান। বিশ্ব প্রাণী দিবসের এই ভাবনা তাই একটি দিনের আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ নয়; ‘তাদের চোখে’ পৃথিবীকে দেখার সেই চেষ্টা চলতে পারে সারা বছর।

  •  তথ্যসূত্র: World Animal Day (worldanimalday.org), Naturewatch Foundation (naturewatch.org), World Animal Net (উইম ডি কোক)