সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি থেকে পৃথিবীকে সুরক্ষাকারী ওজোনস্তর একসময় মানবসৃষ্ট রাসায়নিকের কারণে ভয়াবহ সংকটে পড়েছিল। ক্লোরোফ্লোরোকার্বন (সিএফসি) ও অন্যান্য ওজোন ক্ষয়কারী পদার্থের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে বৈশ্বিক উদ্যোগ শুরুর পর প্রায় চার দশক পেরিয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ ও বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নে এখন ওজোন স্তরের দীর্ঘমেয়াদি পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত মিলছে।
এই অগ্রগতির পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে ১৯৮৭ সালে গৃহীত মন্ট্রিয়ল প্রটোকল। জাতিসংঘের পরিবেশবিষয়ক কর্মসূচির (ইউএনইপি) তথ্য অনুযায়ী, নিয়ন্ত্রিত ওজোন ক্ষয়কারী পদার্থের প্রায় ৯৯ শতাংশ পর্যায়ক্রমে বন্ধ করা সম্ভব হয়েছে।
প্রতিবছর ১৬ সেপ্টেম্বর পালিত হয় বিশ্ব ওজোন দিবস বা আন্তর্জাতিক ওজোনস্তর সংরক্ষণ দিবস। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য—‘গ্লোবাল অ্যাকশন ফর আ কুলার প্ল্যানেট বা পৃথিবীকে শীতল রাখতে বৈশ্বিক উদ্যোগ’। এবার দিনটিতে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে ২০১৬ সালে গৃহীত কিগালি সংশোধনীর ১০ বছর পূর্তি এবং টেকসই ও জ্বালানি-সাশ্রয়ী শীতলীকরণ ব্যবস্থায় রূপান্তরের প্রয়োজনীয়তা।
যে সংকট বিশ্বকে এক করেছিল
১৯৮০-এর দশকে বিজ্ঞানীরা দেখতে পান, মানুষের ব্যবহৃত সিএফসি ও হ্যালনের মতো রাসায়নিক বায়ুমণ্ডলের স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে পৌঁছে ওজোন অণু ভেঙে দিচ্ছে। অ্যান্টার্কটিকার আকাশে ওজোনস্তরের ব্যাপক ক্ষয় এই সংকটকে বিশ্বমঞ্চে সামনে আনে।
এরপর ১৯৮৫ সালে গৃহীত হয় ভিয়েনা কনভেনশন। এর দুই বছর পর ১৯৮৭ সালে আসে মন্ট্রিয়ল প্রটোকল। এর মাধ্যমে ওজোন ক্ষয়কারী রাসায়নিকের উৎপাদন ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে দেশগুলো একটি বাধ্যতামূলক আন্তর্জাতিক কাঠামোর আওতায় আসে।
পরবর্তী সময়ে লন্ডন, কোপেনহেগেন, মন্ট্রিয়ল ও বেইজিং সংশোধনীর মাধ্যমে এই চুক্তি আরও শক্তিশালী হয়। ২০১৬ সালে যোগ হয় কিগালি সংশোধনী।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই ধারাবাহিক নিয়ন্ত্রণের ফলে বায়ুমণ্ডলে দীর্ঘস্থায়ী ওজোন ক্ষয়কারী পদার্থের পরিমাণ কমেছে এবং ওজোনস্তর পুনরুদ্ধারের অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
ওজোনস্তর কি সত্যিই ফিরছে?
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) সর্বশেষ ওজোন ও ইউভি বুলেটিন প্রকাশিত হয়েছে বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬)। এতে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের অ্যান্টার্কটিক ওজোন গহ্বর গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে কম তীব্রগুলোর একটি ছিল। ১৯৯২ সালের পর তীব্র ওজোন ক্ষয়ের সময়ের তুলনায় এটি ছিল চতুর্থ থেকে পঞ্চম ক্ষুদ্রতম পর্যায়ে। একই সঙ্গে ২০২৫ সালে ওজোন গহ্বরের গভীরতা ও বিস্তার—দুটিই ১৯৯০–২০১০ সালের গড়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম ছিল।
অ্যারোনটিক্স অ্যান্ড স্পেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (নাসা) ও ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফিয়ারিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (নোয়া) হিসাবে, ২০২৫ সালের ৭ সেপ্টেম্বর থেকে ১৩ অক্টোবর পর্যন্ত ওজোন গহ্বরের গড় আয়তন ছিল প্রায় ১৮ দশমিক ৭১ মিলিয়ন বর্গকিলোমিটার। ১৯৯২ সালের পর এটি ছিল পঞ্চম ক্ষুদ্রতম গড় আয়তন। ৯ সেপ্টেম্বর সর্বোচ্চ এক দিনের আয়তন দাঁড়ায় প্রায় ২২ দশমিক ৮৬ মিলিয়ন বর্গকিলোমিটার, যা ২০০৬ সালের সর্বোচ্চ গড় আয়তনের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ কম।
তবে একক কোন বছরের তথ্য দিয়ে পুরো পুনরুদ্ধার সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায় না। অ্যান্টার্কটিক ওজোন গহ্বরের আকার ও গভীরতা বছরে বছরে পরিবর্তিত হয়। তাপমাত্রা, বায়ুপ্রবাহ এবং অ্যান্টার্কটিকাকে ঘিরে থাকা মেরু ঘূর্ণির মতো বায়ুমণ্ডলীয় পরিস্থিতিও এতে প্রভাব ফেলে। তাই বিজ্ঞানীরা বার্ষিক ওঠানামার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
পুনরুদ্ধারে কত সময় লাগবে?
ডব্লিউএমও ও ইউএনইপি-র ২০২২ সালের সর্বশেষ পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নে বলা হয়েছিল, বর্তমান নীতি ও মন্ট্রিয়ল প্রটোকলের পূর্ণ বাস্তবায়ন অব্যাহত থাকলে বিশ্বের অধিকাংশ অঞ্চলে ওজোনস্তর ১৯৮০ সালের মাত্রায় ফিরতে পারে ২০৪০ সালের দিকে। আর্কটিক অঞ্চলে বিশেষ সংবেদনশীলতার কারণে লাগতে পারে ২০৪৫ সাল পর্যন্ত এবং অ্যান্টার্কটিকায় পুরোদমে পুনরুদ্ধার হতে ২০৬৬ সাল পর্যন্ত লেগে যেতে পারে।
তবে এই সময়সীমাগুলো ২০২২ সালের বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নের মডেলভিত্তিক পূর্বাভাস। ২০২৬ সালের নতুন চার বছর মেয়াদি বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন প্রতিবেদনটি চলতি বছরের শেষ নাগাদ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হওয়ার কথা রয়েছে।
কিগালি সংশোধনী কেন গুরুত্বপূর্ণ?
ওজোনস্তর রক্ষার পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার আন্তর্জাতিক উদ্যোগে নতুন মাত্রা যোগ করেছে কিগালি সংশোধনী। ২০১৬ সালে গৃহীত এই সংশোধনীর লক্ষ্য হাইড্রোফ্লোরোকার্বন বা এইচএফসি জাতীয় গ্রিনহাউস গ্যাসের উৎপাদন ও ব্যবহার ধাপে ধাপে কমিয়ে আনা। এইচএফসি সাধারণত সরাসরি ওজোনস্তর ক্ষয় না করলেও বৈশ্বিক উষ্ণায়নে বড় ভূমিকা রাখে।
এ কারণে শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ও হিমায়ন খাতে এইচএফসি কমানোর পাশাপাশি তুলনামূলক কম জলবায়ু-প্রভাবসম্পন্ন এবং বেশি জ্বালানি-দক্ষ প্রযুক্তিতে যাওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
চলতি ২০২৬ সালের বিশ্ব ওজোন দিবসের প্রতিপাদ্যও সরাসরি এই পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত। ‘গ্লোবাল অ্যাকশন ফর আ কুলার প্ল্যানেট’ প্রতিপাদ্যে কিগালি সংশোধনীর ১০ বছর পূর্তি এবং টেকসই শীতলীকরণকে সামনে আনা হয়েছে।
ডব্লিউএমও-এর তথ্য অনুযায়ী, কিগালি সংশোধনীর পূর্ণ বাস্তবায়ন শতাব্দীর শেষ নাগাদ বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির পরিমাণ শূন্য দশমিক পাঁচ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত কমাতে সহায়তা করতে পারে। জ্বালানি-দক্ষ শীতলীকরণের সঙ্গে এটি বাস্তবায়িত হলে জলবায়ু সুবিধা আরও বাড়তে পারে।
সাফল্যের মধ্যেও নতুন ঝুঁকি
ওজোনস্তর পুনরুদ্ধারের অর্থ এই নয় যে সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে। কেননা সাফল্যের পাশাপাশি নতুন কিছু উদ্বেগও সামনে এসেছে।
ডব্লিউএমও বলছে, দীর্ঘমেয়াদি ও উচ্চমানের পর্যবেক্ষণ অব্যাহত রাখা জরুরি। স্যাটেলাইট, স্থলভিত্তিক পর্যবেক্ষণ এবং অন্যান্য বায়ুমণ্ডলীয় পরিমাপের মাধ্যমে ওজোনের পরিবর্তন এবং নিয়ন্ত্রিত রাসায়নিকের উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
চলতি বছর প্রকাশিত একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণায় শিল্পে অন্য রাসায়নিক তৈরির কাঁচামাল বা ফিডস্টক (feedstock) হিসেবে ব্যবহৃত কিছু ওজোন ক্ষয়কারী পদার্থের নির্গমন নিয়ে নতুন উদ্বেগ সামনে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, এসব পদার্থের নির্গমন আগে ধারণা করা মাত্রার চেয়ে বেশি হতে পারে এবং সংশ্লিষ্ট উৎপাদন ও ব্যবহারও কমার বদলে বেড়েছে।
এটি দেখায়, মন্ট্রিয়ল প্রটোকলের আওতায় নিয়ন্ত্রিত প্রধান পদার্থের ব্যবহার কমে এলেও নতুন ও পরোক্ষ নির্গমন উৎস শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন রয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য কী বার্তা?
বাংলাদেশ মন্ট্রিয়ল প্রটোকলের অংশীদার এবং ২০২০ সালের ৮ জুন কিগালি সংশোধনী অনুমোদন করেছে। দেশের জন্য ওজোন ক্ষয়কারী পদার্থের পাশাপাশি এইচএফসি কমানো এবং শীতলীকরণ খাতকে আরও দক্ষ ও পরিবেশবান্ধব করার বিষয়টিও এখন গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘের ওজোন সেক্রেটারিয়েটের তথ্যমতে, বাংলাদেশে ‘এইচএফসি লাইসেন্সিং সিস্টেম (HFC licensing system)’ চালু রয়েছে।
উষ্ণ আবহাওয়া ও নগরায়ণের কারণে শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ও হিমায়ন ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশবান্ধব রেফ্রিজারেন্ট, জ্বালানি-দক্ষ যন্ত্রপাতি, সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ এবং ব্যবহৃত রেফ্রিজারেন্টের নিরাপদ পুনরুদ্ধার ও ব্যবস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
এ ছাড়া বাংলাদেশের ২০২৫ সালে উপস্থাপিত তৃতীয় জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান বা এনডিসি ৩.০-তেও কিগালি সংশোধনী অনুযায়ী এইচএফসি ব্যবহার কমানোর বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
চার দশকের অভিজ্ঞতা কী শেখায়?
ওজোনস্তরের সংকট মোকাবিলার ইতিহাস দেখিয়েছে, বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিকভাবে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া হলে বৈশ্বিক পরিবেশগত সমস্যায় পরিবর্তন আনা সম্ভব।
ভিয়েনা কনভেনশন থেকে মন্ট্রিয়ল প্রটোকল, এরপর কিগালি সংশোধনী—প্রায় চার দশকের এই পথচলায় বিজ্ঞান, নীতি, শিল্প ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা একসঙ্গে কাজ করেছেে।
এবারের বিশ্ব ওজোন দিবস তাই শুধু একটি পরিবেশ দিবস নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি আন্তর্জাতিক পরিবেশ সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণও।
তবে পুনরুদ্ধারের পথ এখনো শেষ হয়নি। ওজোনস্তরকে সুরক্ষিত রাখতে বিদ্যমান আন্তর্জাতিক চুক্তির বাস্তবায়ন যেমন জরুরি, তেমনি নতুন রাসায়নিক, শিল্পপ্রক্রিয়া, প্রযুক্তি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের ওপর নজর রাখাও প্রয়োজন।
প্রায় চার দশকের আন্তর্জাতিক উদ্যোগে ওজোনস্তর পুনরুদ্ধারের পথে এগিয়েছে। এখন বড় প্রশ্ন হলো—এই অগ্রগতি কীভাবে ধরে রাখা যায় এবং একই সঙ্গে ক্রমবর্ধমান শীতলীকরণ চাহিদা মেটাতে কীভাবে আরও টেকসই প্রযুক্তিতে যাওয়া যায়।
তথ্যসূত্র: ইউএনইপি ওজোন সেক্রেটারিয়েট, ডব্লিউএমও, ইউএন