ভুটানের গাসা জেলায় শিনতাফু হিমবাহ হ্রদের বাঁধ ভেঙে মো ছু নদীতে আকস্মিক বন্যা দেখা দিয়েছে। এতে একটি উষ্ণ প্রস্রবণকেন্দ্র, সড়ক ও সৌরবিদ্যুৎচালিত সেচ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যার পানি ভারতের দিকে নেমে আসার আশঙ্কায় পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের কয়েকটি জেলায় সতর্কতা জারি করা হয়। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সন্ধ্যায় ভুটানের গাসা জেলার ওয়াকিলা পর্বতের নিচে অবস্থিত শিনতাফু হ্রদের বাঁধ ভেঙে এই আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়। হ্রদটি দেশটির ১৭টি সম্ভাব্য বিপজ্জনক হিমবাহ হ্রদের একটি।
হিমবাহ গলে সৃষ্ট হ্রদের প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে হঠাৎ বিপুল পরিমাণ পানি নেমে আসার ঘটনাকে হিমবাহ হ্রদ সৃষ্ট আকস্মিক বন্যা বা গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড (জিএলওএফ) বলা হয়। হিমবাহের গলন, ভারী বৃষ্টিপাত, ভূমিধস কিংবা তুষারধসের মতো কারণে এ ধরনের বন্যা হতে পারে। হিমালয় অঞ্চলে এ ঝুঁকি মোকাবিলায় হ্রদ পর্যবেক্ষণ, আগাম সতর্কবার্তা এবং সীমান্তবর্তী দেশগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময় গুরুত্বপূর্ণ।
ভুটানের জাতীয় জলবিদ্যা ও আবহাওয়া কেন্দ্রের (এনসিএইচএম) তথ্য অনুযায়ী, হ্রদটি মো ছু নদীর অববাহিকার উঁচু এলাকায় অবস্থিত। হ্রদ থেকে হঠাৎ পানি নেমে আসায় নদীর পানিপ্রবাহ বেড়ে যায়।
বন্যায় গাসা জেলার জনপ্রিয় প্রাকৃতিক উষ্ণ প্রস্রবণকেন্দ্র গাসা ছাচুর স্থাপনাগুলো ভেসে গেছে। এ ছাড়া পুনাখা জেলার দোছুখা-জোমলিংথাং-রিতসা এলাকার একটি সৌরবিদ্যুৎচালিত সেচ প্রকল্প আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে অচল হয়ে পড়েছে। পাহাড়ি উপত্যকা থেকে নেমে আসা পাথর ও মাটির কারণে পুনাখা-গাসা মহাসড়কের একটি অংশও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। লায়া এলাকার সঙ্গে যোগাযোগের সড়কটির একটি অংশ চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে।
তবে বন্যার আগেই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) সকাল পর্যন্ত ভুটানে কোনো প্রাণহানি বা আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাবও নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি।
হ্রদের পানির উচ্চতা পর্যবেক্ষণের জন্য তাকতসিমাখাং এলাকায় পর্যবেক্ষণব্যবস্থা থাকলেও বাঁধ ভাঙার আগে কোনো সতর্কসংকেত পাওয়া গিয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এদিকে বন্যার পানি নেমে আসার পর তাকতসিমাখাং এলাকায় সিনতাফু ছু ও লুংগু ছু নদীর মিলনস্থলে নতুন একটি হ্রদের সৃষ্টি হয়েছে বলে জানিয়েছে এনসিএইচএম। সংস্থাটি মো ছু ও পুনাতসাংছু নদীর উপত্যকায় বসবাসকারীদের নদীর তীর ও বন্যাপ্রবণ এলাকা এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে।
শিনতাফু হ্রদ থেকে নেমে আসা পানি মো ছু নদী দিয়ে প্রবাহিত হয়ে পুনাতসাংছু নদীতে মেশে। নদীটি ভারতের ভূখণ্ডে প্রবেশের পর সংকোশ নামে পরিচিত। পরে এটি ব্রহ্মপুত্র নদব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
ভারতের কেন্দ্রীয় জল কমিশন (সিডব্লিউসি) ২৯ অক্টোবর বিশেষ বন্যা সতর্কতা জারি করে। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ভুটান থেকে নেমে আসা বন্যার পানি ৬ থেকে ৮ ঘণ্টার মধ্যে ভারত-ভুটান সীমান্তে পৌঁছাতে পারে। এতে পশ্চিমবঙ্গের আলিপুরদুয়ার ও আসামের ধুবড়ি জেলায় সংকোশ নদীর পানির উচ্চতা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হয়।
এ পরিস্থিতিতে পশ্চিমবঙ্গের আলিপুরদুয়ার, দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি ও কোচবিহারের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সতর্কতা জারি করা হয়। নদীতীরবর্তী এলাকা থেকে বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। কোচবিহারের তুফানগঞ্জ ও বক্সিরহাট এলাকায় জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলা বাহিনী (এনডিআরএফ) ও রাজ্য দুর্যোগ মোকাবিলা বাহিনীর (এসডিআরএফ) সদস্যদের প্রস্তুত রাখা হয়। আসামের ধুবড়ি জেলাতেও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
তবে ৩০ অক্টোবর বিকেলে পাওয়া খবরে জানা যায়, বন্যার পানি সংকোশ নদী দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার পর উত্তরবঙ্গে বড় ধরনের বন্যা দেখা দেয়নি। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়া অনেক বাসিন্দাও আশ্রয়কেন্দ্র থেকে বাড়ি ফিরেছেন। আসামেও নদীর পানির উচ্চতা পর্যবেক্ষণ অব্যাহত ছিল।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স, আইসিআইএমওডি-এর বিজ্ঞপ্তি, ভুটানের এনসিএইচএমের সতর্কবার্তা, ভারতের কেন্দ্রীয় জল কমিশনের সতর্কতা, ইউএনআই