বনের প্রাণীরা কি শান্তিতে থাকতে পারবে?
সুন্দরবনের প্রাণীদের জন্য শুধু গাছপালা ও খাদ্য থাকাই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন আবাসস্থল, নিরাপদে চলাচলের সুযোগ ও স্বাভাবিক পরিবেশ। একটি এলএনজি টার্মিনাল চালু হলে রাতের আলো, যন্ত্রপাতির শব্দ, নৌযান চলাচল, পাইপলাইন রক্ষণাবেক্ষণ এবং মানুষের আনাগোনা বাড়বে। এতে নদীর তীর, বনের প্রান্ত ও সংলগ্ন জলপথ ব্যবহারকারী প্রাণীদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হতে পারে।
বাঘ, হরিণ, বুনো শূকরসহ বিভিন্ন স্তন্যপায়ী প্রাণীর খাদ্য সংগ্রহ, বিশ্রাম ও চলাচলে প্রভাব পড়তে পারে। কৃত্রিম আলো নিশাচর প্রাণীদের আচরণ বদলে দিতে পারে। পাইপলাইন বা প্রবেশপথের অবকাঠামোও কোনো কোনো ক্ষেত্রে আবাসস্থলের মধ্যে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে।
কর্মস্থল ঘিরে মানুষের চলাচল বাড়লে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর মুখোমুখি হওয়ার ঘটনাও বাড়তে পারে। বনের ক্ষতি করতে সব সময় বিশাল এলাকা পরিষ্কার করার প্রয়োজন হয় না। দীর্ঘদিনের শব্দ, আলো ও মানুষের উপস্থিতিও প্রাণীদের পরিচিত আবাসস্থল ব্যবহারের ধরন বদলে দিতে পারে।
সুন্দরবননির্ভর মানুষের জীবিকা কোথায় দাঁড়াবে?
সুন্দরবনের পরিবেশ নিয়ে আলোচনায় প্রায়ই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আড়ালে পড়ে যায়—এই বনের ওপর নির্ভরশীল মানুষের জীবন-জীবিকা। উপকূলের বহু পরিবার মাছ ধরা, কাঁকড়া সংগ্রহ, বনজ সম্পদ আহরণ ও নদীপথে পরিবহনের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে।
নদীর পানি দূষিত হলে, মাছের আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হলে কিংবা ড্রেজিং ও জাহাজ চলাচলের কারণে মাছের প্রাপ্যতা কমে গেলে এসব মানুষের আয়ে প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র মৎস্যজীবী ও কাঁকড়া সংগ্রহকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।
টার্মিনালের নিরাপত্তার কারণে আশপাশের কিছু জলপথে ছোট নৌযানের চলাচল সীমিত হলে জেলেদের বিকল্প পথে যেতে হতে পারে। এতে বাড়বে যাতায়াতের সময় ও জ্বালানি খরচ। যেসব পরিবারের আয় কম এবং বিকল্প জীবিকার সুযোগ সীমিত, তাদের জন্য এই পরিবর্তন বড় অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করতে পারে।
অতএব, প্রকল্পটির লাভ-ক্ষতির হিসাব করতে গেলে শুধু গ্যাস আমদানির খরচ কিংবা সরকারের রাজস্ব বিবেচনা করলেই চলবে না। জেলে, কাঁকড়া সংগ্রহকারী, নৌপরিবহনকর্মী ও বননির্ভর মানুষের সম্ভাব্য ক্ষতিও হিসাবের মধ্যে রাখতে হবে।
প্রথম পর্ব পড়ুন: সুন্দরবনের বুকে এলএনজি টার্মিনাল, ঝুঁকি কতটা? (পর্ব ১)
প্রকৌশলগত ঝুঁকি: নদী কি এত বড় স্থাপনা সামলাতে পারবে?
আকরাম পয়েন্টে একটি ভাসমান সংরক্ষণ ও পুনঃগ্যাসীকরণ ইউনিট (এফএসআরইউ) স্থাপনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রকৌশলগত চ্যালেঞ্জ রয়েছে। জোয়ার-ভাটা, নদীর স্রোত ও প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যে জাহাজটি নিরাপদে রাখা সম্ভব হবে কি না, সেটি বড় প্রশ্ন।
বড় এলএনজি জাহাজের জন্য শুধু নদীর গভীরতা জানাই যথেষ্ট নয়। জাহাজের ড্রাফট বা পানির নিচে নিমজ্জিত অংশের গভীরতা, নদীর তলদেশের সঙ্গে নিরাপদ দূরত্ব, চ্যানেলের প্রস্থ, মোড় নেওয়ার জায়গা এবং জরুরি অবস্থায় জাহাজ সরানোর সুযোগও বিবেচনায় নিতে হবে।
নদীতে পলি জমে নতুন চর তৈরি হলে জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি হতে পারে। খারাপ আবহাওয়ায় জাহাজের প্রবেশ বা বের হওয়া বন্ধ রাখতে হতে পারে। এতে এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হলে জাতীয় গ্যাস সরবরাহব্যবস্থায়ও প্রভাব পড়তে পারে।
তাই নির্দিষ্ট সময়ে নদীর গভীরতা মেপে টার্মিনাল নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া যথেষ্ট নয়। দীর্ঘমেয়াদি পলি পরিবহন, স্রোত ও নৌচলাচলের বাস্তবতা বুঝে প্রকল্পটির উপযোগিতা যাচাই করতে হবে।
নরম পলিমাটির ওপর কতটা নিরাপদ হবে অবকাঠামো?
এফএসআরইউ ভাসমান হলেও এর সঙ্গে যুক্ত সব অবকাঠামো ভাসমান নয়। নোঙর, পাইপলাইন, গ্যাস সংযোগ এবং তীরবর্তী স্থাপনার জন্য উপযুক্ত ভিত্তি প্রয়োজন। সুন্দরবনসংলগ্ন বদ্বীপীয় অঞ্চলের পলিমাটির গঠন ও ভার বহনের ক্ষমতা সব জায়গায় এক নয়।
প্রস্তাবিত স্থাপনাগুলোর ভার ও চাপ নদীর তলদেশ এবং তীরবর্তী মাটি নিরাপদে বহন করতে পারবে কি না, তা বিস্তারিত ভূপ্রযুক্তিগত পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করা প্রয়োজন। মাটির ভারবহন ক্ষমতা কম হলে স্থাপনা অসমভাবে বসে যেতে পারে, নোঙরের ধারণক্ষমতা কমতে পারে কিংবা নদীর তলদেশ সরে যাওয়ায় পাইপলাইনের কোনো অংশ মাটির সমর্থন হারাতে পারে।
নদীর তলদেশ ও তীরের স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হলে অবকাঠামোর নিরাপত্তাও ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এসব সমস্যা প্রযুক্তিগতভাবে সমাধান করা সম্ভব কি না, সম্ভব হলে কত ব্যয়ে এবং কত দিন ধরে—সেটিও প্রকল্পের অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা নিরূপণের অংশ হওয়া উচিত।
ঘূর্ণিঝড়ের সময় কী হবে?
বাংলাদেশের দক্ষিণ উপকূল ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, তীব্র স্রোত ও প্রতিকূল আবহাওয়ার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এমন এলাকায় একটি বড় এলএনজি জাহাজকে দীর্ঘদিন একই স্থানে নিরাপদে নোঙর করে রাখা সহজ কাজ নয়।
মুরিং বা নোঙরব্যবস্থাকে বাতাস, ঢেউ, স্রোত ও জাহাজের নড়াচড়ার সম্মিলিত চাপ সহ্য করতে হয়। চরম আবহাওয়ায় এই ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলে জাহাজ নির্ধারিত অবস্থান থেকে সরে যেতে পারে। এলএনজি স্থানান্তরের সরঞ্জামও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
তাই প্রকৌশল নকশায় স্বাভাবিক আবহাওয়ার পাশাপাশি সম্ভাব্য চরম পরিস্থিতিও বিবেচনায় নিতে হবে। ঘূর্ণিঝড়ের আগে এলএনজি স্থানান্তর বন্ধ করা, সরঞ্জাম নিরাপদে বিচ্ছিন্ন করা, কর্মীদের সরিয়ে নেওয়া এবং টার্মিনালকে নিরাপদ অবস্থায় নেওয়ার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকা জরুরি। এসব ব্যবস্থা কত দ্রুত ও নির্ভরযোগ্যভাবে কার্যকর করা যাবে, তা আগেই যাচাই করা প্রয়োজন।
এলএনজি লিক হলে বিপদ কতটা?
এলএনজি ক্যারিয়ার থেকে এফএসআরইউতে তরল গ্যাস স্থানান্তরের সময় যন্ত্রপাতির ত্রুটি, ভুল সংযোগ, জাহাজের অতিরিক্ত নড়াচড়া কিংবা মানবিক ভুলের কারণে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। মহেশখালী এলএনজি টার্মিনালে গত জুলাইয়ে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাও এ প্রসঙ্গে স্মরণ করা প্রয়োজন।
এলএনজি ছড়িয়ে পড়লে অত্যন্ত শীতল তরল দ্রুত বাষ্পে রূপ নিতে পারে। বাতাসের গতি, তাপমাত্রা ও আশপাশের পরিবেশের ওপর নির্ভর করে সেই বাষ্প ছড়িয়ে পড়তে পারে। উপযুক্ত পরিস্থিতিতে দাহ্য গ্যাসের মেঘ আগুনের উৎসের সংস্পর্শে এলে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি তৈরি হয়।
তাই গ্যাস শনাক্তকরণ, জরুরি শাটডাউন, অগ্নিনিরাপত্তা ও দুর্ঘটনা মোকাবিলার কার্যকর ব্যবস্থা থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুন্দরবনের মতো দুর্গম ও পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল এলাকায় দুর্ঘটনা ঘটলে উদ্ধার ও ক্ষয়ক্ষতি নিয়ন্ত্রণ আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
পাইপলাইনও কি নতুন ঝুঁকি তৈরি করবে?
আকরাম পয়েন্ট থেকে মোংলা বা অন্য কোনো গ্যাস গ্রহণকারী স্থাপনা পর্যন্ত পাইপলাইন বসাতে হলে সেটিও আলাদা প্রকৌশলগত ও পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। পাইপলাইনে ক্ষয়, জোড়ায় ত্রুটি, নোঙর ফেলা কিংবা ড্রেজিংয়ের কারণে ক্ষতি হতে পারে। নদীর তলদেশ সরে গেলে বা মাটি দেবে গেলে পাইপলাইনের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ার আশঙ্কা থাকে।
পাইপলাইন বা এর সংযোগস্থলে ছিদ্র হলে গ্যাস বেরিয়ে যেতে পারে। দুর্গম এলাকায় সেই লিক শনাক্ত করতে দেরি হলে পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হতে পারে। উচ্চ চাপে গ্যাস নির্গত হলে আগুন লাগার ঝুঁকিও থাকে।
অতএব, পাইপলাইনের পথ নির্বাচন, নির্মাণপদ্ধতি, ক্ষয়রোধী ব্যবস্থা, নিয়মিত পরীক্ষা ও দ্রুত লিক শনাক্ত করার প্রযুক্তি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা দরকার।
নদীপথে দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়বে না তো?
আকরাম পয়েন্টে টার্মিনাল চালু হলে জোয়ার-ভাটাপ্রভাবিত নদীপথে বড় জাহাজের চলাচল বাড়বে। এসব নদীতে স্রোতের পরিবর্তন, পলি জমা, অগভীর স্থান ও কম দৃশ্যমানতার মতো সমস্যা রয়েছে। বড় জাহাজের চলাচল বাড়লে নৌপথ ব্যবস্থাপনা আরও জটিল হতে পারে।
যন্ত্রপাতির ত্রুটি, মানবিক ভুল, অপর্যাপ্ত চ্যানেল কিংবা তীব্র স্রোতের কারণে জাহাজের সঙ্গে জাহাজের সংঘর্ষ বা তলদেশে আটকে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। এতে এলএনজি জাহাজের পাশাপাশি মাছ ধরার নৌকা ও অন্যান্য ছোট নৌযানও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
বিশেষ করে বড় জাহাজ ও ছোট নৌযান একই জলপথ ব্যবহার করলে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা এবং চলাচল নিয়ন্ত্রণের কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন।
পরিবেশগত ক্ষতি ও প্রকৌশলগত ব্যর্থতা আলাদা নয়
পরিবেশগত ও প্রকৌশলগত ঝুঁকি পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। নোঙরব্যবস্থার ব্যর্থতা, পাইপলাইনের ক্ষতি কিংবা গ্যাস স্থানান্তরের সরঞ্জামে ত্রুটি বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। সেই দুর্ঘটনা নদী, বন ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি করতে পারে।
অন্যদিকে, ভুল ড্রেজিং পরিকল্পনা, নদীর তীর সুরক্ষায় দুর্বল প্রকৌশলগত সিদ্ধান্ত কিংবা পলি পরিবহনের বাস্তবতা উপেক্ষা করলেও দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত ক্ষতি হতে পারে। তাই শুধু জাহাজ বা পাইপলাইনের নিরাপত্তা দেখলে চলবে না। পুরো নদী, বন, নৌপথ, অবকাঠামো ও মানববসতির ওপর সম্মিলিত প্রভাব বিবেচনায় নিতে হবে।
অর্থনৈতিকভাবে প্রকল্পটি কতটা যুক্তিসংগত?
এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের পক্ষে একটি বড় যুক্তি হলো, এটি দেশের জ্বালানি সরবরাহ বাড়াতে সাহায্য করবে। কিন্তু প্রকল্পটি অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক কি না, তা নির্ধারণে শুধু নির্মাণব্যয় ও গ্যাস সরবরাহের সম্ভাবনা বিবেচনা করলেই চলে না।
আকরাম পয়েন্টের ক্ষেত্রে নিয়মিত ড্রেজিং, নৌচ্যানেল রক্ষণাবেক্ষণ, ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলার ব্যবস্থা, মুরিং ও পাইপলাইন রক্ষণাবেক্ষণ এবং জরুরি দুর্ঘটনা ব্যবস্থাপনার ব্যয়ও হিসাব করতে হবে। এর সঙ্গে যুক্ত হবে পরিবেশগত ক্ষতি প্রতিরোধ, পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজন হলে পুনরুদ্ধারের খরচ।
প্রকল্পের কারণে মাছ ও কাঁকড়া আহরণ কমে গেলে, জেলেদের যাতায়াত ব্যয় বাড়লে কিংবা বননির্ভর মানুষের জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেই সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতিও বিবেচনায় নিতে হবে। প্রতিকূল আবহাওয়া, পলি জমা বা নৌচলাচলের সমস্যায় টার্মিনাল বন্ধ থাকলে গ্যাস সরবরাহে কী প্রভাব পড়বে, সেটিও হিসাবের অংশ হওয়া উচিত।
একটি প্রকল্প নির্মাণ করা সম্ভব হলেই যে সেটি দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিকভাবে যুক্তিসংগত হবে, এমন নয়। বিশেষ করে ঋণের অর্থে প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সব ধরনের ব্যয় ও ঝুঁকির হিসাব আরও গুরুত্বপূর্ণ।
আইন কী বলছে, ইউনেসকোর অবস্থানই বা কী?
আকরাম পয়েন্টে এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের ক্ষেত্রে পরিবেশ ও প্রকৌশলের পাশাপাশি আইনি প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। সুন্দরবন সংরক্ষিত বনাঞ্চল। এর একটি অংশ ইউনেসকো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত রামসার জলাভূমি।
এমন একটি অঞ্চলে বড় শিল্প স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে জাতীয় আইন, পরিবেশ সংরক্ষণবিধি, বন সংরক্ষণসংক্রান্ত বিধান ও আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার বিবেচনায় নিতে হবে। প্রকল্পটি সুন্দরবনের বিশ্ব ঐতিহ্যগত মূল্য ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে কি না, তা বিশেষভাবে পরীক্ষা করা জরুরি।
শুধু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বা পরিবেশগত ছাড়পত্র পেলেই সব আইনি প্রশ্নের নিষ্পত্তি হয়ে যায় না। প্রকল্পটি সংশ্লিষ্ট আইন ও সংরক্ষণবিধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা স্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ইউনেসকোর মূল্যায়নে প্রকল্পটি সুন্দরবনের বিশ্ব ঐতিহ্যগত মর্যাদার জন্য অগ্রহণযোগ্য ঝুঁকি তৈরি করছে বলে বিবেচিত হলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সুনামও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সুতরাং প্রকল্পটি চূড়ান্ত করার আগে এর আইনি অনুমোদনযোগ্যতা ও আন্তর্জাতিক সংরক্ষণসংক্রান্ত বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে পরিষ্কার অবস্থান প্রয়োজন।
সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে যেসব প্রশ্নের উত্তর চাই
আকরাম পয়েন্টে এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কয়েকটি মৌলিক প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর পাওয়া জরুরি।
১. সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য, ম্যানগ্রোভের শিকড়ব্যবস্থা, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও ডলফিনের আবাসস্থলের ওপর প্রকল্পটির স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কতটা?
২. বড় এলএনজি জাহাজ চলাচলের জন্য কতটা ড্রেজিং প্রয়োজন হবে? কত দিন পরপর তা করতে হবে এবং খনন করা পলি কোথায় ফেলা হবে?
৩. জোয়ার-ভাটা, পলি জমা, নদীর তলদেশের পরিবর্তন ও ঘূর্ণিঝড়ের বাস্তবতায় টার্মিনালটি কতটা নিরাপদ থাকবে?
৪. পাইপলাইন, নোঙরব্যবস্থা ও অন্যান্য স্থাপনার জন্য নদীর তলদেশ এবং উপকূলীয় মাটির প্রকৌশলগত সক্ষমতা কতটা?
৫. এলএনজি লিক, অগ্নিকাণ্ড, জাহাজের সংঘর্ষ কিংবা পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হলে কত দ্রুত দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে?
৬. জেলে, কাঁকড়া সংগ্রহকারী, নৌপরিবহনকর্মী ও বননির্ভর মানুষের জীবিকার সম্ভাব্য ক্ষতি কীভাবে নিরূপণ ও মোকাবিলা করা হবে?
৭. নির্মাণব্যয়ের পাশাপাশি ড্রেজিং, রক্ষণাবেক্ষণ, পরিবেশ সুরক্ষা, দুর্যোগ প্রস্তুতি ও সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ অর্থনৈতিক হিসাব করা হয়েছে কি?
৮. সুন্দরবনের বিশ্ব ঐতিহ্যগত মর্যাদা, সংরক্ষিত বনাঞ্চলের আইন ও আন্তর্জাতিক পরিবেশগত অঙ্গীকারের সঙ্গে প্রকল্পটি সামঞ্জস্যপূর্ণ কি?
৯. সুন্দরবনের মতো সংবেদনশীল এলাকার বাইরে অপেক্ষাকৃত কম ঝুঁকিপূর্ণ কোনো বিকল্প স্থানে টার্মিনাল স্থাপন সম্ভব কি না, তা যথাযথভাবে পরীক্ষা করা হয়েছে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ছাড়া শুধু জ্বালানি চাহিদার যুক্তিতে প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়া দূরদর্শী সিদ্ধান্ত হবে না।
জ্বালানি চাই, কিন্তু কোন মূল্যে?
বাংলাদেশের জ্বালানি প্রয়োজন। শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন, অর্থনীতি ও মানুষের দৈনন্দিন জীবনের জন্য নির্ভরযোগ্য গ্যাস সরবরাহ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সুরক্ষাব্যবস্থাকে ঝুঁকির মুখে ফেলা কতটা যুক্তিসংগত?
সুন্দরবন শুধু গাছপালার সমষ্টি নয়। এটি একটি জীবন্ত বাস্তুতন্ত্র। এর নদী, পলি, শিকড়, মাছ, ডলফিন, বাঘ, হরিণ ও মানুষের জীবন-জীবিকা পরস্পরের সঙ্গে জড়িত। এই জটিল সম্পর্কের কোনো একটি অংশে বড় ধরনের আঘাত লাগলে তার প্রভাব অন্য অংশেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
একটি এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা থাকলেই সেটি সুন্দরবনের বুকে স্থাপন করা উচিত—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। প্রথমে জানতে হবে, প্রকল্পটি পরিবেশগতভাবে গ্রহণযোগ্য, প্রকৌশলগতভাবে নিরাপদ, অর্থনৈতিকভাবে যুক্তিসংগত ও আইনগতভাবে অনুমোদনযোগ্য কি না। একই সঙ্গে এর চেয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ কোনো বিকল্প আছে কি না, তাও যাচাই করতে হবে।
কারণ, একটি শিল্প স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হলে অর্থ ব্যয় করে মেরামত করা যায়। নৌচ্যানেল পলিতে ভরাট হলে আবার খনন করা যায়। পাইপলাইন নষ্ট হলে বদলানোও সম্ভব। কিন্তু সুন্দরবনের মতো একটি প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রের গভীর ক্ষতি হলে তাকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব নাও হতে পারে।
উন্নয়ন অবশ্যই দরকার। কিন্তু সেই উন্নয়নের মূল্য যদি হয় সুন্দরবনের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি, তাহলে লাভের হিসাব নতুন করে কষতেই হবে। সুন্দরবন আমাদের শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করে যাওয়ার এক অমূল্য আমানত। সেই আমানত রক্ষার দায়ও আমাদের।
লেখক: গৌরাঙ্গ নন্দী, স্বাধীন সাংবাদিক ও পরিবেশবিষয়ক লেখক
খুলনা | ২৫ অক্টোবর ২০২৬
যোগাযোগ: ০১৭১৬ ৬৩৯৪৬১
* (মতামত লেখকের নিজস্ব)