বিজ্ঞাপন

‘এল নিনোর’ প্রভাবে মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশে ৬৭০০ মৃত্যুর শঙ্কা

rainfall_in_Asia2026.jpg
বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের ধরনে প্রভাব ফেলতে পারে এল নিনো। ছবি: ডব্লিউএমও

জলবায়ু পরিস্থিতির পরিবর্তনে বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের ধরনে প্রভাব ফেলতে পারে এল নিনো। এর ফলে বিভিন্ন অঞ্চলে তাপপ্রবাহ, খরা ও বন্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা উদ্যোগ ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাবের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৭ সালের মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশে অতিরিক্ত প্রায় ৬ হাজার ৭০০ জনের তাপজনিত কারণে মৃত্যুর আশঙ্কা রয়েছে। একই সময়ে বিশ্বজুড়ে এ ধরনের মৃত্যুর সংখ্যা ৩ লাখ ৭৩ হাজার ছাড়াতে পারে।

ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাবের ট্র্যাকার অনুযায়ী, বাংলাদেশে চলতি বছরের অক্টোবরে তাপজনিত মৃত্যুর সংখ্যা ৩৬০, নভেম্বরে ১ হাজার ২০০, ডিসেম্বরে ৫২০ এবং ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে ৩৩০ হতে পারে। ফেব্রুয়ারিতে এ সংখ্যা ৬০০ এবং মার্চে ৩ হাজার ৭০০-তে পৌঁছাতে পারে।

ট্র্যাকারটির হিসাবে, ২০২৬ সালের জুন থেকে ২০২৭ সালের মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশে তাপজনিত মৃত্যুর পূর্বাভাস ১৮ হাজার ৪০০। তবে এসব সংখ্যা মডেলভিত্তিক পূর্বাভাস, নিশ্চিত বা ইতিমধ্যে ঘটে যাওয়া মৃত্যুর হিসাব নয়। মাসভিত্তিক সংখ্যার যোগফল ও প্রকাশিত মোট হিসাবের মধ্যে সামান্য পার্থক্য থাকায় অক্টোবর–মার্চের মোট সংখ্যাটি আনুমানিক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

কী এই এল নিনো?

এল নিনো হলো নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেড়ে যাওয়ার একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত অবস্থা। এটি বায়ুমণ্ডলীয় প্রবাহ ও বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে দিতে পারে। এর প্রভাব অঞ্চলভেদে ভিন্ন হয়—কোথাও তাপপ্রবাহ ও খরার ঝুঁকি বাড়ে, আবার কোথাও অতিবৃষ্টি ও বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছরের শেষ দিকে এল নিনো আরও শক্তিশালী হয়ে ডিসেম্বর নাগাদ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৩ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি হতে পারে। এই বিচ্যুতি ১৯৫০ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাসে উল্লেখ করা হয়েছে।

ডব্লিউএমও বলছে, এল নিনোর প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি তাপমাত্রা এবং বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। এতে অঞ্চলভেদে খরা ও বন্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। ২০২৭ সালের শুরুর দিকেও এর প্রভাব অব্যাহত থাকতে পারে।

বিশ্বজুড়ে ৩ লাখ ৭৩ হাজার মৃত্যুর পূর্বাভাস

ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাবের প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়েছে, অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে অতিরিক্ত প্রায় ৩ লাখ ৭৩ হাজার তাপজনিত মৃত্যুর পূর্বাভাস রয়েছে। ২০২৬ সালের জুন থেকে ২০২৭ সালের মার্চ পর্যন্ত পুরো সময়ের জন্য এই সংখ্যা প্রায় ৮ লাখ ৫৭ হাজার।

দেশভিত্তিক হিসাবে, আগামী ছয় মাসে নাইজেরিয়ায় প্রায় ৫৬ হাজার এবং ভারতে প্রায় ৫৫ হাজার তাপজনিত অতিরিক্ত মৃত্যুর পূর্বাভাস রয়েছে। এ ছাড়া ইন্দোনেশিয়ায় প্রায় ২৯ হাজার এবং ব্রাজিলে প্রায় ১৯ হাজার মৃত্যুর আশঙ্কা করা হয়েছে। ভারতে পূর্বাভাস দেওয়া মৃত্যুর বড় অংশ ঘটতে পারে আগামী বছরের মার্চে।

ট্র্যাকারটি তৈরি করা হয়েছে তাপমাত্রা ও মৃত্যুহারের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা, ইতিমধ্যে পর্যবেক্ষণ করা তাপমাত্রার তথ্য এবং মৌসুমি আবহাওয়ার পূর্বাভাসের ভিত্তিতে। এতে স্থানীয় জলবায়ু, মানুষের ঝুঁকিপ্রবণতা ও পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সক্ষমতাও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। হিসাবগুলোতে ১৯৯৬ থেকে ২০২৫ সালের গড় পরিস্থিতির তুলনায় অতিরিক্ত মৃত্যুর অনুমান করা হয়েছে।

ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাবের সহপ্রতিষ্ঠাতা মাইকেল গ্রিনস্টোনের ভাষ্য, তাপপ্রবাহের প্রাণঘাতী প্রভাব আগে থেকে অনুমান করতে পারলে কোন এলাকার মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন, তা চিহ্নিত করা সম্ভব। এতে প্রাণহানি ঘটার আগেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

বাংলাদেশের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?

বাংলাদেশে তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে কৃষক, নির্মাণশ্রমিক, রিকশাচালকসহ বাইরে কাজ করা মানুষের দীর্ঘ সময় গরমে থাকার কারণে তাপজনিত অসুস্থতার ঝুঁকি বাড়ে। তবে পূর্বাভাসে মৃত্যুর সংখ্যা কত হবে, তা আবহাওয়ার বাস্তব পরিস্থিতি এবং ঝুঁকি মোকাবিলায় নেওয়া ব্যবস্থার ওপরও নির্ভর করবে।

তাপজনিত অসুস্থতা ও প্রাণহানি কমাতে আগাম সতর্কবার্তা, পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা, শীতল স্থানে আশ্রয় এবং স্বাস্থ্যসেবায় দ্রুত প্রবেশাধিকার গুরুত্বপূর্ণ। ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাবের ট্র্যাকারও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে আগাম প্রস্তুতি ও সম্পদ বণ্টনে সহায়তার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে।