বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় ‘মুরাসু’ শক্তি বাড়িয়ে ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূলের দিকে এগোচ্ছে। ভারতের আবহাওয়া অধিদপ্তরের (আইএমডি) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ঘূর্ণিঝড়টি আরও শক্তিশালী হয়ে প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে। আগামী মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) রাত ১২টা থেকে ভোর ৪টা ৩০ মিনিটের মধ্যে নেল্লোর ও নারসাপুরের মধ্যবর্তী উপকূল অতিক্রম করতে পারে এটি।
এদিকে ঘূর্ণিঝড়টির প্রভাবে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় সতর্কতা জারি করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। রবিবার (১ নভেম্বর) দুপুর ২টার বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে দেশের চার সমুদ্রবন্দরকে ১ নম্বর দূরবর্তী সতর্কসংকেত নামিয়ে ২ নম্বর দূরবর্তী হুঁশিয়ারি সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ঘূর্ণিঝড়টির কেন্দ্র রবিবার বেলা ১২টায় চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে ১ হাজার ৩৫০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে, কক্সবাজার থেকে ১ হাজার ২৯০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে, মোংলা থেকে ১ হাজার ২৬০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে এবং পায়রা সমুদ্রবন্দর থেকে ১ হাজার ২৪৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থান করছিল।
ঘূর্ণিঝড়টির কেন্দ্রের ৫৪ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের একটানা সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ৬২ কিলোমিটার। দমকা অথবা ঝোড়ো হাওয়ার আকারে তা ঘণ্টায় ৮৮ কিলোমিটার পর্যন্ত বাড়ছে। ঘূর্ণিঝড়কেন্দ্রের কাছে সাগর খুবই উত্তাল রয়েছে।
অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূলে আঘাত হানতে পারে মঙ্গলবার ভোরে
ভারতের আবহাওয়া অধিদপ্তরের ১ নভেম্বরের ঘূর্ণিঝড়সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, গত ছয় ঘণ্টায় ঘূর্ণিঝড়টি ঘণ্টায় ২৭ কিলোমিটার বেগে পশ্চিম-উত্তর-পশ্চিম দিকে এগিয়েছে। বিজ্ঞপ্তিটি ১ নভেম্বর সকাল ৯টা ইউটিসির পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে প্রকাশ করা হয়। ওই সময় ঘূর্ণিঝড়টির কেন্দ্র ছিল ১২ দশমিক ৪ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশ ও ৮৪ দশমিক ৬ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশে।
আইএমডির পরবর্তী পূর্বাভাস অনুযায়ী, ঘূর্ণিঝড়টি পশ্চিম-উত্তর-পশ্চিম দিকে এগিয়ে ২ নভেম্বর বাংলাদেশ সময় সকাল ৬টার দিকে প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে। এরপর উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে ৩ নভেম্বর রাত ১২টা থেকে ভোর ৪টা ৩০ মিনিটের মধ্যে ভারতের দক্ষিণ অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূল অতিক্রম করতে পারে। এ সময় বাতাসের একটানা সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ১০০ থেকে ১১০ কিলোমিটার হতে পারে। দমকা হাওয়ার বেগ ঘণ্টায় ১২০ কিলোমিটার পর্যন্ত উঠতে পারে।
ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে অন্ধ্রপ্রদেশের উপকূলীয় নিচু এলাকায় জলোচ্ছ্বাসের আশঙ্কাও রয়েছে। আইএমডির পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, জোয়ারের স্বাভাবিক উচ্চতার চেয়ে প্রায় ১ থেকে দেড় মিটার বেশি উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে দক্ষিণ উপকূলীয় অন্ধ্রপ্রদেশের নিচু এলাকা প্লাবিত হতে পারে। বাপটলা, গুন্টুর, কৃষ্ণা ও প্রকাশম জেলায় জলোচ্ছ্বাসের প্রভাব বেশি পড়তে পারে।
বাংলাদেশের জেলেদের সতর্কতা
বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত উপকূলের কাছাকাছি থাকতে এবং সাবধানে চলাচল করতে বলা হয়েছে।
মুরাসু নামের অর্থ কী?
ঘূর্ণিঝড়টির নাম ‘মুরাসু’ দিয়েছে ভারত। শব্দটি তামিল ভাষার। এর অর্থ ঢাক বা যুদ্ধের দামামা। প্রাচীন তামিল সমাজে যুদ্ধের ঘোষণা, বিপদের সতর্কবার্তা কিংবা গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ প্রচারে এ ধরনের বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করা হতো।
সঙ্গম সাহিত্য দক্ষিণ ভারতের প্রাচীনতম ধ্রুপদী তামিল সাহিত্য। পাণ্ড্য রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় মাদুরাই ও এর আশপাশের অঞ্চলে কবিদের সমাবেশ বা ‘সঙ্গম’ গড়ে উঠেছিল। এই সাহিত্যিক পরিমণ্ডলে রচিত ও সংকলিত কবিতায় প্রাচীন তামিল সমাজ, রাজনীতি, যুদ্ধ ও সংস্কৃতির নানা দিক উঠে এসেছে। সেই সময়ের সমাজে ‘মুরাসু’ ছিল গুরুত্বপূর্ণ একটি বাদ্যযন্ত্র।
ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ কীভাবে হয়?
বঙ্গোপসাগর ও আরব সাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়ের নাম দেয় বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) অধীন জাতিসংঘের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিশনের (এসকাপ) ঘূর্ণিঝড়বিষয়ক প্যানেলের সদস্যদেশগুলো। বাংলাদেশ, ভারত, ইরান, মালদ্বীপ, মিয়ানমার, ওমান, পাকিস্তান, কাতার, সৌদি আরব, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইয়েমেন—এই ১৩টি দেশ প্যানেলের সদস্য।
প্রতিটি দেশ আগেই একাধিক নাম প্রস্তাব করে। সেগুলো থেকে ধারাবাহিকভাবে ঘূর্ণিঝড়ের নাম দেওয়া হয়। ‘অর্ণব’ নামটি প্রস্তাব করেছিল বাংলাদেশ। আর ‘মুরাসু’ নামটি দিয়েছে ভারত।
অর্ণবের ছয় দিনের মাথায় নতুন ঘূর্ণিঝড়
এর আগে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’ গত ২৮ অক্টোবর ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূলে আঘাত হানে। সেই ঘূর্ণিঝড়ের মাত্র ছয় দিনের মাথায় একই অঞ্চলে নতুন ঘূর্ণিঝড়ের সৃষ্টি হলো।
প্রবল ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণবের’ প্রভাবে অন্তত তিনজনের মৃত্যু হয়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় ঘরবাড়ি, সড়ক ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো। ঝড় ও ভারী বৃষ্টিতে উপকূলীয় জেলাগুলোতে কৃষিজমি ও ফসলেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়। প্রতিবেশী ওড়িশাতেও ভারী বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ার আশঙ্কায় বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল।