ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশের দক্ষিণ উপকূলে আঘাত হেনেছে প্রবল ঘূর্ণিঝড় ‘মুরাসু’। ঝড়ের প্রভাবে উপকূলীয় এলাকায় গাছপালা ও বিদ্যুতের খুঁটি উপড়ে পড়েছে। ব্যাহত হয়েছে বিদ্যুৎ সরবরাহ ও যোগাযোগব্যবস্থা। তবে উপকূল অতিক্রমের পর ঝড়টি দুর্বল হয়ে পড়ায় বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দরগুলোকে সতর্কসংকেত নামিয়ে ফেলতে বলেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) ভোররাত সাড়ে ৩টা থেকে সাড়ে ৫টার মধ্যে (ভারতীয় স্থানীয় সময়) ভারতের দক্ষিণ অন্ধ্র উপকূল অতিক্রম করে ঘূর্ণিঝড় ‘মুরাসু’। ভারতের আবহাওয়া বিভাগ (আইএমডি) জানিয়েছে, উপকূল অতিক্রমের সময় ঝড়টির একটানা বাতাসের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ১০০ থেকে ১১০ কিলোমিটার। দমকা হাওয়ার গতিবেগ ঘণ্টায় ১২০ কিলোমিটার পর্যন্ত উঠেছিল।
ঘূর্ণিঝড়টির প্রভাবে অন্ধ্রপ্রদেশের উপকূলীয় এলাকায় ভারী বৃষ্টিপাত ও প্রবল বাতাস বয়ে যায়। এতে নিচু এলাকাগুলোতে প্লাবনের আশঙ্কা তৈরি হয়।
অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের (এপিএসডিএমএ) পরিচালক প্রখর জৈন জানিয়েছেন, ঝড়ের প্রভাবে বিস্তীর্ণ এলাকায় গাছপালা ও বিদ্যুতের খুঁটি উপড়ে পড়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো প্রাণহানি বা আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।
দুর্বল ঘূর্ণিঝড়, বাংলাদেশের বন্দরে সংকেত নামানোর নির্দেশ
দক্ষিণ অন্ধ্র উপকূল অতিক্রমের পর ঘূর্ণিঝড় ‘মুরাসু’ দুর্বল হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের ঝড় সতর্কীকরণ কেন্দ্র মঙ্গলবার বিশেষ বিজ্ঞপ্তি নম্বর ১২-তে জানিয়েছে, ঘূর্ণিঝড়টি দক্ষিণ অন্ধ্রপ্রদেশ ও তৎসংলগ্ন উপকূলীয় এলাকায় অবস্থান করছে। এটি আরও উত্তর-উত্তরপশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে ক্রমে দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সমুদ্রবন্দর, উত্তর বঙ্গোপসাগর ও বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার ওপর দিয়ে ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যাওয়ার আশঙ্কা নেই। এ কারণে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে সতর্কসংকেত নামিয়ে ফেলতে বলা হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, ঘূর্ণিঝড় ‘মুরাসু’ নিয়ে এ সিরিজে আর কোনো বিশেষ আবহাওয়া বিজ্ঞপ্তি প্রচার করা হবে না।
‘অর্ণবের’ পর এবার ‘মুরাসু’, গতিপথ কোন দিকে?
ঝড়ের সর্বশেষ অবস্থান ও গতিপথ
ভারতের আবহাওয়া বিভাগের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, মঙ্গলবার সকাল ৯টা ইউটিসি (বাংলাদেশ সময় বিকেল ৩টা) পর্যন্ত ‘মুরাসু’ ঘণ্টায় ৭ কিলোমিটার গতিতে উত্তর-উত্তরপশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে প্রবল ঘূর্ণিঝড় থেকে সাধারণ ঘূর্ণিঝড়ে দুর্বল হয়েছে।
এ সময় ঘূর্ণিঝড়টির কেন্দ্র ছিল ১৬ দশমিক ০ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশ ও ৮০ দশমিক ১ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশে। এটি বাপাতলা থেকে ৪০ কিলোমিটার পশ্চিম-উত্তরপশ্চিমে, ওঙ্গোল থেকে ৬০ কিলোমিটার উত্তরে, বিজয়ওয়াড়া থেকে ৮০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে, কাভালি থেকে ১২০ কিলোমিটার উত্তরে এবং মছিলিপত্তনম থেকে ১১০ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থান করছিল।
ওই সময় ঝড়টির একটানা বাতাসের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ৮০ থেকে ৯০ কিলোমিটার। দমকা হাওয়ায় তা ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত উঠছিল।
ভারতের আবহাওয়া বিভাগের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ঘূর্ণিঝড়টি উত্তর-উত্তরপশ্চিম দিকে অগ্রসর হতে থাকবে এবং মঙ্গলবার সন্ধ্যা নাগাদ গভীর নিম্নচাপে দুর্বল হয়ে যেতে পারে। এ পর্যায়ে বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ৫৫ থেকে ৬৫ কিলোমিটার এবং দমকা হাওয়ার গতিবেগ ৭৫ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে।
বৃষ্টিপাত ও ক্ষয়ক্ষতি
ঘূর্ণিঝড় ‘মুরাসু’র প্রভাবে অন্ধ্রপ্রদেশের দক্ষিণ উপকূলীয় এলাকায় ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে। সোমবার সকাল সাড়ে ৮টা থেকে মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় বাপাতলায় সর্বোচ্চ ২২২ দশমিক ৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
এ ছাড়া নরসাপুরে ১৯৮ দশমিক ৬ মিলিমিটার, ওঙ্গোলে ১২০ দশমিক ২ মিলিমিটার, মছিলিপত্তনমে ৮৩ দশমিক ৯ মিলিমিটার, বান্দ্রাবেলায় ৭৫ মিলিমিটার এবং পুদুচেরিতে ৬৫ দশমিক ৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে।
প্রবল বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ায় উপকূলীয় নিচু এলাকায় প্লাবনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় জনজীবনেও বিঘ্ন ঘটেছে।
এক সপ্তাহের ব্যবধানে পরপর দুটি ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে অন্ধ্রপ্রদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে দুর্যোগ মোকাবিলা ও পুনরুদ্ধার কার্যক্রমের ওপর চাপ বেড়েছে।
সাগরে প্রবল ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’, সমুদ্রবন্দরে সংকেত
‘অর্ণবের’ ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার আগেই নতুন আঘাত
এর আগে গত বুধবার অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূলে আঘাত হেনেছিল অতিপ্রবল ঘূর্ণিঝড় ‘অর্ণব’। ওই ঝড়ের আঘাতে রাজ্যটিতে অন্তত ছয়জনের মৃত্যু হয়।
প্রথম ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার আগেই নতুন করে ‘মুরাসু’র আঘাতে অন্ধ্রপ্রদেশের উপকূলীয় জনপদগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরপর দুটি ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে রাজ্যটির উপকূলীয় এলাকায় জনজীবন ও অবকাঠামোর ওপর চাপ বেড়েছে।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর, ভারতের আবহাওয়া বিভাগ, দ্য নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, আল জাজিরা