বিজ্ঞাপন

ডিএসসিসির ৭৫ ওয়ার্ডের ২৯টিতেই এডিস মশার উচ্চ ঝুঁকি

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২০২৬ সালের বর্ষাকালীন এডিস মশার লার্ভার ঘনত্বের ওয়ার্ডভিত্তিক মানচিত্র।
ডিএসসিসির বর্ষাকালীন এডিস মশার লার্ভা জরিপে ব্রেটো ইনডেক্স অনুযায়ী ওয়ার্ডভিত্তিক ঝুঁকির চিত্র। ছবি: ডিএসসিসি

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ২৯টিতে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়াবাহী এডিস মশার উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে। বর্ষাকালীন এডিস মশার লার্ভা জরিপে দেখা গেছে, পরিদর্শন করা ২ হাজার ২৫০টি বাড়ির মধ্যে ৩২২টিতে মশার লার্ভা ও পিউপা পাওয়া গেছে। অর্থাৎ নমুনা হিসেবে নেওয়া প্রায় ১৪ দশমিক ৩১ শতাংশ বাড়িতে এডিস মশার উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

বুধবার (৪ নভেম্বর) রাজধানীর নগর ভবন মিলনায়তনে ‘বর্ষাকালীন এডিস মশার লার্ভা জরিপ ২০২৬’-এর ফলাফল প্রকাশ ও পরবর্তী কর্মপরিকল্পনা নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়। এতে জরিপের ফল তুলে ধরেন ডিএসসিসির প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম।

ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া কী

ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া—দুটিই এডিস মশাবাহিত ভাইরাসজনিত রোগ। ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্ত এডিস মশার কামড়ে মানুষের শরীরে সংক্রমণ ছড়ায়। এ রোগের সাধারণ উপসর্গের মধ্যে রয়েছে জ্বর, মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, বমি বমি ভাব, শরীর ও অস্থিসন্ধিতে ব্যথা এবং ত্বকে ফুসকুড়ি। গুরুতর ক্ষেত্রে রক্তক্ষরণ, শক ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কার্যকারিতা ব্যাহত হওয়ার মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয়বার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে গুরুতর অসুস্থতার ঝুঁকি বাড়তে পারে।

অন্যদিকে, চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হলে সাধারণত হঠাৎ জ্বর ও তীব্র অস্থিসন্ধির ব্যথা দেখা দেয়। মাথাব্যথা, পেশিতে ব্যথা, ত্বকে ফুসকুড়ি ও অতিরিক্ত ক্লান্তিও হতে পারে। অধিকাংশ রোগী এক সপ্তাহের মধ্যে সুস্থ হয়ে উঠলেও কারও কারও অস্থিসন্ধির ব্যথা কয়েক সপ্তাহ বা মাস ধরে থাকতে পারে। ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার সংক্রমণ কমাতে এডিস মশার বংশবিস্তার রোধ এবং মশার কামড় থেকে সুরক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।

গত ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে ৮ অক্টোবর পর্যন্ত ১২ দিন ধরে বর্ষাকালীন এডিস মশার লার্ভা জরিপ পরিচালনা করা হয়। ডিএসসিসির ৭৫টি ওয়ার্ডের প্রতিটি থেকে দৈবচয়নের ভিত্তিতে ৩০টি করে ২ হাজার ২৫০টি বাড়ি নমুনা হিসেবে নির্বাচন করা হয়। ডিএসসিসি ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার ৩৬ জন মাঠকর্মী জরিপে অংশ নেন।

আরও পড়ুন
এডিসের লার্ভা শনাক্তে জরিপ শুরু ডিএসসিসির

তথ্য সংগ্রহে ‘কোবোটুলবক্স’ নামের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করা হয়। পরে ব্রেটো ইনডেক্স (বিআই), হাউস ইনডেক্স (এইচআই), কন্টেইনার ইনডেক্স (সিআই) ও পিউপা ইনডেক্স (পিআই) ব্যবহার করে মশার ঘনত্ব ও প্রজনন পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়।

অধিক ও মাঝারি ঝুঁকিতে ৭৬ শতাংশ ওয়ার্ড

লার্ভার ঘনত্বের ভিত্তিতে ডিএসসিসির ৭৫টি ওয়ার্ডকে তিনটি ঝুঁকিশ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৯টি অধিক ঝুঁকিপূর্ণ, ২৮টি মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ১৮টি সাধারণ ঝুঁকিপূর্ণ। অর্থাৎ অধিক ও মাঝারি ঝুঁকির দুই শ্রেণিতে রয়েছে ৫৭টি ওয়ার্ড, যা দক্ষিণ সিটির মোট ওয়ার্ডের ৭৬ শতাংশ।

🚨 ওয়ার্ডভিত্তিক ঝুঁকির বিন্যাস (সর্বমোট ৭৫টি ওয়ার্ড)

১. অধিক ঝুঁকিপূর্ণ— ২৯টি ওয়ার্ড 
১, ২, ৯, ১১, ১২, ১৩, ১৪, ১৫, ১৬, ১৯, ২০, ২১, ২২, ২৪, ২৫, ২৬, ২৭, ৩১, ৫৩, ৫৪, ৫৫, ৫৬, ৫৮, ৫৯, ৬০, ৬১, ৬২, ৬৫ ও ৭১।
২. মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ— ২৮টি ওয়ার্ড
৪, ৫, ৬, ৮, ১০, ১৮, ২৩, ২৯, ৩০, ৩২, ৩৩, ৩৫, ৩৬, ৩৭, ৩৮, ৩৯, ৪০, ৪৩, ৪৬, ৫১, ৫২, ৫৭, ৬৪, ৬৭, ৬৮, ৬৯, ৭৩ ও ৭৫।
৩. সাধারণ ঝুঁকিপূর্ণ— ১৮টি ওয়ার্ড
৩, ৭, ১৭, ২৮, ৩৪, ৪১, ৪২, ৪৪, ৪৫, ৪৭, ৪৮, ৪৯, ৫০, ৬৩, ৬৬, ৭০, ৭২ ও ৭৪।

ব্রেটো ইনডেক্সের মান অনুযায়ী, ২০ থেকে ৬৭ পর্যন্ত সূচক থাকা ২৯টি ওয়ার্ডকে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ এবং ১০ থেকে ১৯ পর্যন্ত সূচক থাকা ২৮টি ওয়ার্ডকে মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বাকি ১৮টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১৬টিতে সূচকের মান ১ থেকে ৯ এবং দুটি ওয়ার্ডে কোনো লার্ভা পাওয়া যায়নি।

অধিক ঝুঁকিপূর্ণ ২৯টি ওয়ার্ড হলো: ১, ২, ৯, ১১, ১২, ১৩, ১৪, ১৫, ১৬, ১৯, ২০, ২১, ২২, ২৪, ২৫, ২৬, ২৭, ৩১, ৫৩, ৫৪, ৫৫, ৫৬, ৫৮, ৫৯, ৬০, ৬১, ৬২, ৬৫ ও ৭১।

মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ ২৮টি ওয়ার্ড হলো: ৪, ৫, ৬, ৮, ১০, ১৮, ২৩, ২৯, ৩০, ৩২, ৩৩, ৩৫, ৩৬, ৩৭, ৩৮, ৩৯, ৪০, ৪৩, ৪৬, ৫১, ৫২, ৫৭, ৬৪, ৬৭, ৬৮, ৬৯, ৭৩ ও ৭৫।

সাধারণ ঝুঁকিপূর্ণ ১৮টি ওয়ার্ড হলো: ৩, ৭, ১৭, ২৮, ৩৪, ৪১, ৪২, ৪৪, ৪৫, ৪৭, ৪৮, ৪৯, ৫০, ৬৩, ৬৬, ৭০, ৭২ ও ৭৪।

বালতি, ড্রাম ও ফুলের টবেও মশার প্রজনন

জরিপে ভবনের ধরন অনুযায়ী লার্ভার উপস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, একক বাড়িতে ৩১ দশমিক ৩৭ শতাংশ, বহুতল ভবনে ৩১ দশমিক ০৬ শতাংশ, সেমিপাকা বাড়িতে ১৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ, নির্মাণাধীন ভবনে ১৩ দশমিক ০৪ শতাংশ এবং খালি প্লটে ৭ দশমিক ১৪ শতাংশ লার্ভার উপস্থিতি রয়েছে।

পাত্র ও জমে থাকা পানির উৎসের মধ্যে প্লাস্টিকের বালতিতে লার্ভার উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি—১৪ দশমিক ২১ শতাংশ। প্লাস্টিকের ড্রামে ১১ দশমিক ২২ শতাংশ, ভবনের বেজমেন্টে জমে থাকা পানিতে ৯ দশমিক ৯৮ শতাংশ, প্লাস্টিকের মগে ৯ দশমিক ২৩ শতাংশ এবং ফুলের টবে ৫ দশমিক ৯৯ শতাংশ লার্ভা পাওয়া গেছে।

এই পাঁচ ধরনের উৎসে লার্ভার উপস্থিতির হার যোগ করলে ৫০ দশমিক ৬৩ শতাংশ হয়। অর্থাৎ এসব উৎসে জমে থাকা পানি অপসারণ ও নিয়মিত পরিষ্কার রাখার মাধ্যমে এডিস মশার প্রজননস্থলের প্রায় অর্ধেক নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব বলে মনে করছে ডিএসসিসি।

ডব্লিউএইচওর পরামর্শ অনুযায়ী, বাড়ি ও আশপাশে পানি জমতে পারে এমন অপ্রয়োজনীয় পাত্র সরিয়ে ফেলতে হবে। প্রয়োজনীয় পানির পাত্র ঢেকে রাখতে হবে এবং সপ্তাহে অন্তত একবার খালি করে ঘষে পরিষ্কার করতে হবে। কারণ, এডিস মশার ডিম শুকনো অবস্থায়ও কয়েক মাস টিকে থাকতে পারে। তাই শুধু পানি ফেলে দিলেই হবে না, পাত্রের গায়েও ভালোভাবে ঘষে পরিষ্কার করতে হবে।

ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বিশেষ অভিযান

নগর ভবন মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ‘বর্ষাকালীন এডিস মশার লার্ভা জরিপ ২০২৬’-এর ফল তুলে ধরেন ডিএসসিসির প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম। ছবি: ডিএসসিসি

সংবাদ সম্মেলনে ডিএসসিসি প্রশাসক আবদুস সালাম বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু সরকারি উদ্যোগই যথেষ্ট নয়; নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ, বাসাবাড়ি ও কর্মস্থলের আশপাশ পরিষ্কার রাখা এবং সপ্তাহে অন্তত এক দিন জমে থাকা পানি অপসারণের অভ্যাস গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। 

তিনি গণমাধ্যমের মাধ্যমে সঠিক তথ্য ও সচেতনতামূলক বার্তা জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে সংবাদকর্মীদের সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন।

জরিপের ফলাফলের ভিত্তিতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে বিশেষ মশকনিধন অভিযান ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে বলে জানান প্রশাসক। তিনি বলেন, এ ছাড়া প্রতি শনিবার ডিএসসিসির নিয়মিত ‘ক্লিনিং ডে’ চলাকালে শিশুদের ডেঙ্গু থেকে সুরক্ষায় দক্ষিণ সিটির সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আঙিনা ও শৌচাগার পরিষ্কারের বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ফলাফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. খয়বর রহমান, সচিব মো. মশিউর রহমান খান, প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমডোর মো. মাহাবুবুর রহমান তালুকদার এবং প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহানে ফেরদৌস বিনতে রহমানসহ বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তা ও আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।