বিজ্ঞাপন

বৈশ্বিক উষ্ণতা ১.৫ ডিগ্রি ছাড়ালে বরফের স্থায়ী ক্ষতির শঙ্কা

বৈশ্বিক উষ্ণায়নে গলে যাচ্ছে মেরু অঞ্চলের বরফ
অ্যান্টার্কটিকার বরফে ঢাকা পাহাড়। ছবি: পেক্সেলস

বৈশ্বিক উষ্ণতা সাময়িকভাবে প্রাক্‌-শিল্পায়ন যুগের তুলনায় ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সীমা ছাড়িয়ে গেলে পৃথিবীর বরফাবৃত অঞ্চল বা হিমমণ্ডলের বড় ধরনের ও দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি হতে পারে। পরে তাপমাত্রা আবার ১ দশমিক ৫ ডিগ্রিতে নামিয়ে আনা হলেও হিমবাহ, গ্রিনল্যান্ড ও অ্যান্টার্কটিকার বরফের ক্ষয় পুরোপুরি থামবে না। তাই তাপমাত্রা এই সীমার ওপরে যত কম সময় থাকবে, ক্ষতি কমানোর সুযোগ তত বেশি থাকবে বলে সতর্ক করেছেন বিজ্ঞানীরা।

‘ওভারশুট অ্যান্ড দ্য ক্রায়োস্ফিয়ার: অ্যাভার্টিং গ্লোবাল মেল্টডাউন’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি ২ নভেম্বর প্রকাশ করেছে ইন্টারন্যাশনাল ক্রায়োস্ফিয়ার ক্লাইমেট ইনিশিয়েটিভ (আইসিসিআই)। জাতিসংঘের পরিবেশবিষয়ক সংস্থার (ইউএনইপি) সঙ্গে সমন্বয়ে তৈরি প্রতিবেদনটিতে ৮০ জনের বেশি মেরু ও পর্বতবিষয়ক বিজ্ঞানী কাজ করেছেন। একই দিনে প্রকাশিত হয়েছে আইসিসিআইয়ের আরেকটি প্রতিবেদন ‘স্টেট অব দ্য ক্রায়োস্ফিয়ার ২০২৬: দ্য কস্ট অব ওভারশুট’।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমাতে ব্যর্থ হলে শতাব্দীর শেষ নাগাদ বৈশ্বিক উষ্ণতা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সীমা ছাড়িয়ে যেতে পারে। তাপমাত্রা যত বেশি এবং যত দীর্ঘ সময় এই সীমার ওপরে থাকবে, বরফ ও তুষারনির্ভর প্রাকৃতিক ব্যবস্থার ক্ষতিও তত বাড়বে। এর কিছু ক্ষতি কয়েক শতাব্দী, এমনকি কয়েক হাজার বছর ধরেও অপরিবর্তিত থাকতে পারে।

হিমবাহ ও মেরু বরফের ক্ষতি সহজে ফিরবে না

হিমমণ্ডল বলতে পৃথিবীর যেসব অঞ্চলে পানি বরফ, তুষার বা হিমায়িত মাটির আকারে থাকে, সেগুলোকে বোঝায়। এর মধ্যে রয়েছে পর্বত হিমবাহ, গ্রিনল্যান্ড ও অ্যান্টার্কটিকার বরফের চাদর, সামুদ্রিক বরফ, তুষার এবং পারমাফ্রস্ট বা চিরহিমায়িত ভূমি। এই ব্যবস্থার পরিবর্তন শুধু মেরু বা পার্বত্য অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকে না; সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা, পানির প্রাপ্যতা এবং জলবায়ুব্যবস্থার ওপরও এর প্রভাব পড়ে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাপমাত্রা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার পর আবার কমিয়ে আনলেও হিমমণ্ডলের সব ক্ষতি ঠেকানো সম্ভব হবে না। তবে উষ্ণায়ন যত কম সময়ের জন্য এবং যত কম মাত্রায় এই সীমা অতিক্রম করবে, ক্ষতির পরিমাণ তত কম রাখা সম্ভব। দ্রুত গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমানো এবং পরে বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন অপসারণের মাধ্যমে কিছু বরফ ও তুষারব্যবস্থার পুনরুদ্ধারের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

আইসিসিআইয়ের হিমবাহবিদ ও প্রতিবেদনটির প্রধান লেখক জেমস কার্কহাম বলেন, হিমমণ্ডল জলবায়ুব্যবস্থার সবচেয়ে সংবেদনশীল উপাদানগুলোর একটি। এর ক্ষতির প্রভাব পড়ে পুরো পৃথিবীর ওপর।

কার্কহামকে উদ্ধৃত করে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছর নেপাল-চীন সীমান্তে বরফ ও পাথরের বড় ও প্রাণঘাতী ধসগুলোর একটি ঘটেছে। ওই ঘটনায় হাজারো মানুষের প্রাণহানি হয়েছে এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নেপালের অর্থনীতির ১০ শতাংশের সমান। তিনি আরও জানান, গত পাঁচ বছরে সুইজারল্যান্ড তার হিমবাহের বরফের ২০ শতাংশ হারিয়েছে। আগামী এক দশকে প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে হাজার হাজার হিমবাহ বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আরও পড়ুন
হিমবাহের গলন ঠেকাতে ভেড়ার লোম?

প্রতিবেদনে নেপালের ওই ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে বলা হয়েছে, পারমাফ্রস্ট বা চিরহিমায়িত ভূমি গলে যাওয়ায় পাহাড়ি ঢাল অস্থিতিশীল হয়ে পড়তে পারে। এতে ভূমিধস, বরফ ও পাথরের ধসের মতো বিপজ্জনক ঘটনা ঘটার ঝুঁকি বাড়ে। পারমাফ্রস্ট গলে গেলে মাটিতে আটকে থাকা কার্বনও বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে, যা উষ্ণায়ন আরও বাড়াতে পারে। নেপালের ঘটনার প্রাণহানি ও অর্থনৈতিক ক্ষতির তথ্য মূল প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হলেও সেখানে ক্ষয়ক্ষতির হিসাবের বিস্তারিত পদ্ধতি দেওয়া হয়নি।

আরও পড়ুন
চার হিমবাহ হ্রদের পানি কমাবে নেপাল, ঝুঁকি কাটবে?

বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গ্রিনল্যান্ড ও অ্যান্টার্কটিকার বরফের চাদর দ্রুত গলছে। আইসল্যান্ডের ছবিটি ম্যাগনিফিকের সৌজন্যে

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, গ্রিনল্যান্ড ও অ্যান্টার্কটিকার বরফের চাদর ১৯৯০-এর দশকের তুলনায় এখন প্রায় ছয় গুণ দ্রুত গলছে। তাপমাত্রা আবার ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নামিয়ে আনলেও এসব বরফের চাদরের ক্ষয় অব্যাহত থাকতে পারে। বরফের এই ক্ষয় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়াবে, যা বিশ্বের উপকূলীয় জনপদগুলোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করছে।

বর্তমান নীতি অব্যাহত থাকলে ঝুঁকি আরও বাড়বে

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমান জলবায়ুনীতি অব্যাহত থাকলে বৈশ্বিক উষ্ণতা প্রায় ২ দশমিক ৮ থেকে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি থাকা প্রায় সব পারমাফ্রস্ট গলে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এতে মেরু সাগরের বাস্তুতন্ত্র ও মহাসাগরের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ব্যবস্থায় গুরুতর পরিবর্তন ঘটতে পারে। মেরু অঞ্চলের সমুদ্রের পানির অম্লতাও বাড়তে পারে।

হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলের হিমবাহের ওপরও উষ্ণায়নের বড় প্রভাব পড়তে পারে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান নীতি অব্যাহত থাকলে এই অঞ্চলের হিমবাহের বরফের মাত্র ৪১ শতাংশ টিকে থাকতে পারে। বৈশ্বিক উষ্ণতা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমিত রাখা গেলে টিকে থাকতে পারে ৮৩ শতাংশ। এই অঞ্চলের হিমবাহ থেকে পাওয়া পানি বিশ্বের প্রায় এক-চতুর্থাংশ মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে যুক্ত।

কিছু বরফ ফিরলেও স্থায়ী ক্ষতি থেকে যাবে

বিজ্ঞানীদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উষ্ণায়নের কারণে বরফ ও তুষারব্যবস্থার কোনো কোনো পরিবর্তন সংকটজনক সীমা বা টিপিং পয়েন্ট অতিক্রম করতে পারে। এমন হলে তাপমাত্রা পরে কমিয়ে আনলেও আগের অবস্থায় ফিরতে কয়েক শতাব্দী বা হাজার বছর লেগে যেতে পারে। সামুদ্রিক বরফ ও হিমবাহের কিছু অংশ পুনরায় বিস্তার লাভ করলেও সব ক্ষতি পূরণ হবে না।

তবে ক্ষতি সীমিত রাখার সুযোগ এখনো রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ জন্য এখন থেকেই প্রতিবছর গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ অন্তত ৫ শতাংশ করে কমাতে হবে এবং শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে নিট শূন্য নিঃসরণে পৌঁছাতে হবে। জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বন্ধের পাশাপাশি মিথেন ও ব্ল্যাক কার্বনের নিঃসরণ দ্রুত কমানো এবং বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন অপসারণের উদ্যোগ বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক তাপমাত্রা আবার ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার নিচে নামানো গেলে কয়েক দশক থেকে কয়েক শতাব্দীর মধ্যে কিছু সামুদ্রিক বরফ ও হিমবাহের পুনরায় বিস্তার ঘটতে পারে। তুষারের স্বাভাবিক স্তরও কিছু এলাকায় ফিরে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির গতি কমানো সম্ভব হবে। তবে মেরু অঞ্চলের বরফের চাদর গলে যাওয়ার কারণে কয়েক শতাব্দী ধরে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা কয়েক মিটার বাড়ার আশঙ্কা ইতিমধ্যে তৈরি হয়েছে।

আইসিসিআইয়ের বিজ্ঞানীদের মতে, পৃথিবীর বরফ ও তুষারব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষার জন্য নিরাপদ উষ্ণায়নের সীমা ১ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি, এমনকি এর নিচে হওয়া প্রয়োজন। অর্থাৎ, প্যারিস জলবায়ু চুক্তির ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের লক্ষ্য পূরণ করাও হিমমণ্ডলের জন্য পুরোপুরি নিরাপদ তাপমাত্রা নিশ্চিত করে না।

২০১৫ সালে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলনে গৃহীত হয় প্যারিস জলবায়ু চুক্তি। এটি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বিশ্বের দেশগুলোর জন্য একটি আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক আন্তর্জাতিক চুক্তি। এর মূল লক্ষ্য, প্রাক্‌-শিল্পায়ন যুগের তুলনায় বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের অনেক নিচে রাখা এবং তা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রির মধ্যে সীমিত রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানো। এ লক্ষ্য অর্জনে প্রতিটি দেশকে নিজস্ব সক্ষমতা ও পরিস্থিতি অনুযায়ী গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমানোর পরিকল্পনা বা জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান (এনডিসি) জমা দিতে হয়। প্রতি পাঁচ বছর পর এসব পরিকল্পনা হালনাগাদ করে আগের চেয়ে বেশি উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। চুক্তিতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় অভিযোজন, উন্নয়নশীল দেশগুলোকে জলবায়ু অর্থায়ন এবং দেশগুলোর অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনার ব্যবস্থাও রয়েছে।

এর আগে গত ২১ অক্টোবর প্রকাশিত ইউএনইপির ‘ইমিশনস গ্যাপ রিপোর্ট ২০২৬: দ্য পয়েন্ট অব রিটার্ন’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক উষ্ণতা সাময়িকভাবে ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যাওয়ার পর তা আবার এই সীমায় ফিরিয়ে আনার সবচেয়ে আশাবাদী পরিস্থিতিতেও শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে তাপমাত্রা ১ দশমিক ৭ থেকে ১ দশমিক ৮ ডিগ্রি পর্যন্ত উঠতে পারে। ২১০০ সালের মধ্যে তাপমাত্রা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি বা তার নিচে নামিয়ে আনার প্রায় ৫০ শতাংশ সম্ভাবনা তৈরি করতে হলে ২০২৫ সালের তুলনায় ২০৩০ সালের মধ্যে গ্রিনহাউস গ্যাসের বৈশ্বিক নিঃসরণ ১৮ শতাংশ এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে ৪৫ শতাংশ কমাতে হবে। এ জন্য নিঃসরণ কমানোর পাশাপাশি বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন অপসারণও বাড়াতে হবে।

আরও পড়ুন
চার বছরে গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমাতে হবে ১৮%: জাতিসংঘ

আইসিসিআইয়ের প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়েছে জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন কপ৩১-এর আগে। প্যারিস জলবায়ু চুক্তির লক্ষ্য বাস্তবায়ন এবং বৈশ্বিক জলবায়ু পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক মঞ্চ এই সম্মেলন। আগামী ৯ থেকে ২০ নভেম্বর তুরস্কের আনতালিয়ায় বসবে কপ৩১। জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশনের (ইউএনএফসিসিসি) অধীনে আয়োজিত এ সম্মেলনে বিভিন্ন দেশের সরকার ও অন্যান্য অংশীজন অংশ নেবেন। সম্মেলনে প্যারিস চুক্তির অঙ্গীকার বাস্তবায়ন, গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমানো, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো এবং জলবায়ু অর্থায়নের মতো বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে।

বিজ্ঞানীদের সতর্কতা হলো, তাপমাত্রা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যাওয়ার সময়কাল ও মাত্রা যতটা সম্ভব কমিয়ে আনতে হবে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে তাপমাত্রা আবার কমিয়ে আনার জন্য এখনই দ্রুত ও গভীরভাবে নিঃসরণ কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে।