স্থানীয়ভাবে তৈরি অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি-পাতিলে রান্না করা খাবারে বিষাক্ত সিসা মিশতে পারে। বিশেষ করে নতুন পাত্রে প্রথমবার রান্নার সময় খাবারে সিসার পরিমাণ সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে। এতে শিশুদের সিসার সংস্পর্শে আসার ঝুঁকি বাড়তে পারে, যা তাদের মস্তিষ্কের বিকাশ, শেখার ক্ষমতা ও আচরণে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করতে পারে। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) ও যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে গবেষণার এসব তথ্য জানায় আইসিডিডিআর,বি।
‘টক্সিক কুকওয়্যার: লিড এক্সপোজার ফ্রম অ্যালুমিনিয়াম পটস ইন বাংলাদেশ’ শিরোনামের গবেষণাটি যুক্তরাজ্যভিত্তিক বিজ্ঞানবিষয়ক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান নেচার গ্রুপের সাময়িকী ‘জার্নাল অব এক্সপোজার সায়েন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল এপিডেমিওলজি’-তে গত ২৫ অক্টোবর প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, পরীক্ষা করা অ্যালুমিনিয়ামের রান্নার পাত্র থেকে খাবারে সিসা মিশেছে। নতুন পাত্রের পাশাপাশি পুরোনো পাত্রেও সিসার উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
আইসিডিডিআর,বির বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, গবেষণায় স্থানীয়ভাবে তৈরি অ্যালুমিনিয়ামের পাত্রে রান্না করা খাবারে কতটা সিসা মিশতে পারে, তা পরীক্ষা করা হয়েছে। পাশাপাশি খাবারের অম্লতা, পাত্র পরিষ্কারের পদ্ধতি এবং রান্নার ধরন সিসা মিশে যাওয়ার পরিমাণে কী প্রভাব ফেলে, সেটিও পরীক্ষা করেছেন গবেষকেরা।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বাংলাদেশে পুরোনো অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি-পাতিল বদলে নতুন পাত্র নেওয়ার প্রচলন রয়েছে। কোথাও কোথাও পুরোনো কাপড়ের বিনিময়েও নতুন পাত্র পাওয়া যায়। গবেষণাটিতে সরাসরি এই বিনিময়প্রথা নিয়ে কাজ করা না হলেও এর ফলাফল থেকে বোঝা যায়, নতুন বা দেখতে চকচকে হলেই একটি রান্নার পাত্র নিরাপদ—এমন ভাবার সুযোগ নেই। কারণ, স্থানীয়ভাবে তৈরি অনেক অ্যালুমিনিয়ামের পাত্র পুরোনো স্ক্র্যাপ ধাতু গলিয়ে তৈরি করা হয়। এসব ধাতু যথাযথভাবে পরীক্ষা না করলে তৈরি পাত্রে সিসা থেকে যেতে পারে। আর সিসার সংস্পর্শ শিশুদের শেখার ক্ষমতা ও আচরণের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, রক্তে সিসার এমন কোনো মাত্রা নেই, যাকে সম্পূর্ণ নিরাপদ বলা যায়।
নতুন পাত্রে সিসার মাত্রা বেশি
গবেষকেরা বাংলাদেশের বিভিন্ন পরিবারের কাছ থেকে সংগ্রহ করা সাতটি ব্যবহৃত অ্যালুমিনিয়ামের পাত্র এবং স্থানীয় বাজার থেকে কেনা ২০টি নতুন পাত্র পরীক্ষা করেন। পাত্রগুলোতে সিসার উপস্থিতি ও পরিমাণ নির্ণয়ের পর সেগুলোতে সাদা ভাত ও খিচুড়ি রান্না করা হয়। এরপর খাবারে সিসার পরিমাণ পরীক্ষা করা হয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, নতুন পাত্রে প্রথমবার রান্নার সময় প্রতি কেজি সাদা ভাতে গড়ে ৩০৫ মাইক্রোগ্রাম এবং খিচুড়িতে গড়ে ৪২০ মাইক্রোগ্রাম সিসা পাওয়া গেছে। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ) শিশু ও ছোট শিশুদের জন্য নির্ধারিত খাবারে সিসার সীমা প্রতি কেজিতে ১০ মাইক্রোগ্রাম রেখেছে।
বারবার ব্যবহারের সঙ্গে নতুন পাত্র থেকে খাবারে সিসা মেশার পরিমাণ কমেছে। তবে তা এফডিএর নির্ধারিত সীমার নিচে নামেনি। ব্যবহৃত সাতটি পাত্রের মধ্যে ছয়টিতে রান্না করা ভাতেও সিসা পাওয়া গেছে।
গ্রামীণ বাংলাদেশের শিশুদের সাধারণ ভাত খাওয়ার পরিমাণ বিবেচনায় নিয়ে গবেষকেরা একটি মডেলভিত্তিক হিসাব করেছেন। তাতে দেখা গেছে, এ ধরনের পাত্রে রান্না করা ভাত খেলে একটি শিশু খাবারের মাধ্যমে দৈনিক সিসা গ্রহণের ক্ষেত্রে এফডিএর নির্ধারিত মাত্রার পাঁচ গুণেরও বেশি সিসা গ্রহণ করতে পারে। তবে শিশুদের সরাসরি পরীক্ষা করে এই পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়নি।
পাত্র পরিষ্কারের পদ্ধতিতে বাড়তে পারে সিসা নির্গমন
গবেষণায় দেখা গেছে, পাত্র পরিষ্কারের পদ্ধতিও খাবারে সিসা মেশার পরিমাণ বাড়াতে পারে। নতুন পাত্র স্টিলের তারের মাজুনি দিয়ে ঘষে পরিষ্কার করলে, এভাবে পরিষ্কার না করা পাত্রের তুলনায় প্রথমবার ব্যবহারে প্রায় পাঁচ গুণ বেশি সিসা নির্গত হয়েছে। দ্বিতীয়বার ব্যবহারের ক্ষেত্রেও ঘষে পরিষ্কার করা পাত্র থেকে প্রায় তিন গুণ বেশি সিসা নির্গত হয়েছে।
এ ছাড়া ধাতব খুন্তি দিয়ে খাবার নাড়লে এবং অম্লীয় খাবারের সংস্পর্শে এলে পাত্র থেকে সিসা নির্গমনের পরিমাণ বেড়েছে।
শিশুদের খাবারে নিরাপদ পাত্র ব্যবহারের পরামর্শ
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের হিউম্যান অ্যান্ড প্ল্যানেটারি হেলথ বিভাগের প্রজেক্ট আনলেডেডের পরিচালক ড. জেনা ফরসিথ বলেন, রান্নার পাত্র ও তাতে তৈরি খাবার—দুটিতেই সিসার পরিমাণ পরীক্ষা করেছেন গবেষকেরা। এর মাধ্যমে দৈনন্দিন রান্নায় ব্যবহৃত একটি সাধারণ পাত্র কীভাবে মানুষের সিসার সংস্পর্শের কারণ হতে পারে, তা বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে।
আইসিডিডিআর,বির এনভায়রনমেন্টাল হেলথ অ্যান্ড ওয়াশ বিভাগের সহকারী বিজ্ঞানী ড. জেসমিন সুলতানা বলেন, ‘পরিবারগুলো অনেক যত্ন নিয়ে প্রতিদিন ভাত ও খিচুড়ি রান্না করে। সেই খাবারে রান্নার পাত্র থেকেই সিসা মিশছে কি না, তা নিয়ে তাদের দুশ্চিন্তা করতে দেওয়া উচিত নয়।’
বিশেষ করে ছোট শিশুদের খাবার তৈরিতে খাদ্যনিরাপত্তার দিক থেকে পরীক্ষিত রান্নার পাত্র ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। এ ছাড়া স্থানীয়ভাবে তৈরি এসব পাত্র ব্যবহার করলে স্টিলের তারের মাজুনি দিয়ে ঘষে পরিষ্কার করা এবং তাতে টক বা অম্লীয় খাবার রান্না করা এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। তবে এসব সতর্কতা দূষিত পাত্রকে পুরোপুরি নিরাপদ করে না।
ড. ফরসিথ বলেন, সিসা দেখা যায় না, এর কোনো গন্ধ বা স্বাদও নেই। ফলে দেখতে ভালো একটি পাত্র থেকেও পরিবারের খাবারে সিসা মিশতে পারে। সাধারণভাবে দেখে কোন পাত্র নিরাপদ, তা বোঝার উপায় নেই।
নিরাপত্তা মান নির্ধারণের আহ্বান
গবেষকদের মতে, রান্নার পাত্র থেকে সিসার সংস্পর্শে আসার ঝুঁকি কমানোর দায়িত্ব শুধু পরিবারের ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। বাংলাদেশে সিসার সংস্পর্শে আসার একাধিক উৎস রয়েছে। এর মধ্যে হলুদে সিসার উপস্থিতিও একটি উদ্বেগের বিষয়। রান্নার পাত্রও সিসার সংস্পর্শের একটি সম্ভাব্য উৎস।
এ ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) ও বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকেরা। তাঁদের প্রস্তাব, রান্নার পাত্রের বিদ্যমান নিরাপত্তা মান ও নীতিমালা পর্যালোচনা, উৎপাদনে ব্যবহৃত স্ক্র্যাপ ধাতু পরীক্ষা এবং তৈরি পাত্র থেকে খাবারে সিসা মিশছে কি না, তা যাচাইয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি ক্ষুদ্র উৎপাদকদের নিরাপদ কাঁচামাল ও পরীক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
আইসিডিডিআর,বির এনভায়রনমেন্টাল হেলথ অ্যান্ড ওয়াশ বিভাগের প্রকল্প সমন্বয়ক ড. মো. মাহবুবুর রহমান বিএফএসএকে রান্নার পাত্র থেকে খাবারে সিসা মিশে যাওয়ার বিষয়ে স্পষ্ট নিরাপত্তা মান নির্ধারণের আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে বিএসটিআইকে রান্নার পাত্রের জন্য সিসাসংক্রান্ত নিরাপত্তা মান তৈরি ও কার্যকর করার অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।
ড. মাহবুবুর রহমান বলেন, সাশ্রয়ী দামের রান্নার পাত্র মানেই অনিরাপদ হওয়া উচিত নয়। উৎপাদনপ্রক্রিয়ার উন্নয়ন ও যথাযথ তদারকির মাধ্যমে পরিবারগুলোকে এ ধরনের প্রতিরোধযোগ্য ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব।
গবেষকেরা জানিয়েছেন, এটি ছোট পরিসরের পরীক্ষাগারভিত্তিক গবেষণা। শিশুদের সিসা গ্রহণের পরিমাণ সরাসরি পরীক্ষা করে নির্ধারণ করা হয়নি; বরং একটি মডেল ব্যবহার করে অনুমান করা হয়েছে। তাই বিভিন্ন ধরনের রান্নার পাত্র ও দৈনন্দিন রান্নার অভ্যাস নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কিং সেন্টার অন গ্লোবাল ডেভেলপমেন্টের সহায়তায় গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে।