বনের সবুজ গাছপালার ফাঁকে মায়ের সঙ্গে ঘুরে বেড়াচ্ছে নীলগাইয়ের চার নতুন শাবক। কখনো মায়ের কাছাকাছি ছোটাছুটি, কখনো অন্য প্রাণীদের সঙ্গে বিচরণ—এভাবেই কাটছে তাদের সময়। গাজীপুর সাফারি পার্কের কোর সাফারি এলাকায় এখন চোখে পড়ে এমন দৃশ্য। প্রায় দেড় মাস আগে পার্কের কর্মীরা প্রথম শাবকগুলোকে একসঙ্গে বিচরণ করতে দেখেন। চার নতুন সদস্যের আগমনে পার্কে নীলগাইয়ের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩টিতে।
শাবকগুলোর নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক বেড়ে ওঠা নিশ্চিত করতে বিশেষ পরিচর্যা ও বাড়তি নজরদারির ব্যবস্থা করেছে পার্ক কর্তৃপক্ষ। জন্মের পর থেকেই তাদের দেখভালের জন্য সার্বক্ষণিক একজন কর্মীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন
নিজের নয়, তবু মৃত শাবকটি বয়ে বেড়াচ্ছিল মাদি হাতি!
একনজরে নীলগাই
নীলগাই হলো এশিয়ার বৃহত্তম হরিণজাতীয় (অ্যান্টিলোপ বা মৃগজাতীয়) বন্যপ্রাণী। বৈজ্ঞানিক নাম: Boselaphus tragocamelus। হিন্দি শব্দ ‘নীল’ এবং ‘গাই’ (গাভী) থেকে এর নামকরণ হয়েছে নীলগাই। প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ নীলগাইয়ের গায়ের রঙ কালচে বা ধূসর-নীলাভ হয়, যা থেকে এ নামের উৎপত্তি। অন্যদিকে, স্ত্রী নীলগাই সাধারণত হালকা বাদামী বা তামাটে রঙের হয়ে থাকে। পুরুষ নীলগাইয়ের মাথায় ছোট শিং থাকলেও স্ত্রী নীলগাই সাধারণত শিংহীন হয়। নীলগাই প্রধানত তৃণভোজী প্রাণী। এরা বিভিন্ন ধরনের ঘাস, গাছের পাতা, কচি ডালপালা এবং ফলমূল খেয়ে বেঁচে থাকে।
মায়ের সতর্ক দৃষ্টিতে বেড়ে ওঠা
কোর সাফারি এলাকার হরিণ সাফারিতে মা নীলগাইয়ের সঙ্গে শাবকগুলোকে প্রথম দেখতে পান পার্কের কর্মীরা। এরপর থেকেই তাদের চলাফেরা ও শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
মানুষের উপস্থিতি টের পেলে মা নীলগাই শাবকদের নিয়ে দ্রুত নিরাপদ দূরত্বে সরে যায়। শাবকগুলোর নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় নিয়ে কাছ থেকে তাদের লিঙ্গ শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
পার্কের বন্যপ্রাণী পরিদর্শক মো. রাজু আহমেদ জানান, শাবকগুলো সুস্থ রয়েছে এবং নিয়মিত মায়ের দুধ পান করছে। মায়ের সঙ্গে ছোটাছুটির পাশাপাশি অন্য প্রাণীদের সঙ্গেও তাদের বিচরণ করতে দেখা যাচ্ছে।
শাবকগুলোর বয়স এখন প্রায় দেড় মাস। তবে চারটির মধ্যে কোনটি পুরুষ আর কোনটি স্ত্রী, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
আরও পড়ুন
জোনাথনের জিনে কি দীর্ঘায়ুর সূত্র?
উদ্ধার করা নীলগাইয়ের বংশবৃদ্ধিতে নতুন প্রজন্ম
দেশের বিভিন্ন সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে উদ্ধার করা নীলগাই এনে গাজীপুর সাফারি পার্কে রাখা হয়। পরবর্তী সময়ে সেখানে প্রজননের মাধ্যমে নতুন শাবকের জন্ম হয়।
পার্ক কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, নতুন চার শাবকের জন্মের আগে সেখানে ১১টি নীলগাই ছিল। এর মধ্যে দুটি নীলগাই কক্সবাজারের ডুলাহাজরা সাফারি পার্কে পাঠানো হয়। ফলে গাজীপুরে অবশিষ্ট ছিল ৯টি নীলগাই। নতুন চার শাবক যুক্ত হওয়ায় বর্তমানে পার্কে নীলগাইয়ের সংখ্যা ১৩টি।
এই বংশবৃদ্ধি পার্কে নীলগাইয়ের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি উদ্ধার করা বন্যপ্রাণীর প্রজনন ও পরিচর্যার ব্যবস্থাপনাকেও তুলে ধরছে।
আরও পড়ুন
অস্তিত্বের সংকটে প্রবালপ্রাচীর!
নিরাপত্তা ও পরিচর্যায় বাড়তি নজরদারি
নতুন শাবকগুলোর জন্ম ও বেড়ে ওঠার বিষয়ে গাজীপুর সাফারি পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মো. তারেক রহমান জানান, দেশের বিভিন্ন সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে উদ্ধার করা নীলগাইয়ের বংশবৃদ্ধির মাধ্যমে পার্কে নতুন চার শাবকের সংযোজন ঘটেছে।
তিনি বলেন, শাবকগুলোর সুস্বাস্থ্য ও নিরাপদ পরিবেশ বজায় রাখতে পার্ক কর্তৃপক্ষ সব সময় তৎপর রয়েছে।
বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ, ঢাকা অঞ্চলের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (চলতি দায়িত্ব) এম কে এম ইকবাল হোছাইন চৌধুরীও শাবকগুলোর নিরাপত্তা ও সার্বিক বিষয়ে বাড়তি তদারকি নিশ্চিত করার নির্দেশনা দিয়েছেন।
মায়ের সান্নিধ্যে বেড়ে ওঠা চার শাবক এখন গাজীপুর সাফারি পার্কের নীলগাই পরিবারের নতুন সদস্য। তাদের স্বাভাবিক বেড়ে ওঠা ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে পার্কে নীলগাইয়ের বংশবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা ধরে রাখাই এখন কর্তৃপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।