কয়েক মাস ধরে ক্রমশ শক্তিশালী হচ্ছে ‘এল নিনো’। প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত এই প্রাকৃতিক জলবায়ুগত ঘটনা এরই মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়ায় প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। ইন্দোনেশিয়া, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে দেখা যাচ্ছে খরা, বন্যা ও তাপপ্রবাহের মতো চরম আবহাওয়া।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) জানিয়েছে, শক্তিশালী এই এল নিনো আরও তীব্র হতে পারে এবং এর প্রভাব ২০২৭ সাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে।
এল নিনোর প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে আবহাওয়ার যে পাঁচটি পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, সেগুলো মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) এক প্রতিবেদনে তুলে ধরেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি। ‘ফাইভ ওয়েজ এল নিনো ইজ অ্যাফেক্টিং দ্য ওয়েদার অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি লিখেছেন বিবিসির প্রধান আবহাওয়া উপস্থাপক সারা কিথ-লুকাস।
১. ইন্দোনেশিয়ায় ২০১৫ সালের পর ভয়াবহ দাবানল, বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি
এল নিনোর বছরে ইন্দোনেশিয়ায় সাধারণত আবহাওয়া বেশি শুষ্ক ও উষ্ণ থাকে। এ বছর দেশটি ২০১৫ সালের পর সবচেয়ে ভয়াবহ দাবানল মৌসুমের মুখোমুখি হয়েছে।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ইন্দোনেশিয়ায় অন্তত ৮ লাখ ৯৫ হাজার ৬৫৭ হেক্টর জমি পুড়ে গেছে। আয়তনের দিক থেকে এটি যুক্তরাজ্যের বৃহত্তর লন্ডন বা গ্রেটার লন্ডনের প্রায় ছয় গুণ। গত বছর এল নিনোর প্রভাব না থাকলেও যে পরিমাণ জমি পুড়েছিল, এবারের পরিমাণ তার দ্বিগুণের বেশি।
দাবানলের কারণে দেশটির বিভিন্ন এলাকায় স্কুল বন্ধ রাখতে হয়েছে এবং হাসপাতালে রোগী ভর্তির সংখ্যা বেড়েছে। সুমাত্রা ও কালিমান্তানের লাখ লাখ মানুষ আগুনের বিষাক্ত ধোঁয়ার সংস্পর্শে এসেছে। শ্বাসতন্ত্রের বিভিন্ন সমস্যায় ভুগেছে প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার মানুষ।
আক্রান্তদের মধ্যে ৪০ হাজারের বেশি অসুস্থতার ঘটনা ঘটেছে খুব কম বয়সী শিশুদের মধ্যে। এসব অসুস্থতার মধ্যে কাশি ও ব্রঙ্কাইটিসের পাশাপাশি নিউমোনিয়ার মতো গুরুতর রোগও রয়েছে।
২. পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে একের পর এক হারিকেন
এল নিনোর প্রভাবে পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে হারিকেনের তৎপরতা সাধারণত বেড়ে যায়। চলতি বছরও অঞ্চলটিতে ঘূর্ণিঝড়ের সক্রিয়তা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
বিবিসির তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে ২২টি নামযুক্ত ঝড় সৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যে ১২টি হারিকেনে পরিণত হয়েছে এবং ১০টি ছিল শক্তিশালী হারিকেন। মৌসুম শেষ হতে আরও দুই মাস বাকি থাকতেই ঝড়ের সংখ্যা স্বাভাবিক একটি মৌসুমের মোট সংখ্যাকে ছাড়িয়ে গেছে।
এল নিনোর সময় সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বেড়ে যায় এবং বায়ুমণ্ডলের ওপরের স্তরে বাতাসের প্রবাহ দুর্বল হতে পারে। এতে ঘূর্ণিঝড়ের শক্তিশালী হয়ে ওঠার অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়।
এর একটি উদাহরণ হারিকেন ‘পলো’। অত্যন্ত উষ্ণ সমুদ্রের পানির কারণে ঝড়টি দ্রুত শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এর বাতাসের ঝাপটার গতি ঘণ্টায় ২৮৫ কিলোমিটার বা ১৮০ মাইল পর্যন্ত পৌঁছেছিল।
পলো ছাড়াও একই সময়ে ওই অববাহিকায় সক্রিয় ছিল আরও দুটি হারিকেন—ওদালিস ও নোলো। এক মাসের মধ্যে এমন ঘটনা ঘটেছে দুবার। এর আগে সেপ্টেম্বর মাসে মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে ‘লোওয়েল’, ‘কারিনা’ ও ‘মেরি’ নামে তিনটি হারিকেন একই সময়ে সক্রিয় ছিল।
বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৫ সালের পর চলতি বছরের আগে প্রশান্ত মহাসাগরে একই সময়ে তিনটি হারিকেন সক্রিয় থাকার ঘটনা ঘটেনি।
৩. আটলান্টিক মহাসাগরে বিরল নিস্তব্ধতা
পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে যখন হারিকেনের তৎপরতা বেড়েছে, তখন উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে দেখা যাচ্ছে প্রায় উল্টো চিত্র। চলতি মৌসুমে সেখানে ঘূর্ণিঝড়ের সক্রিয়তা তুলনামূলক কম।
এল নিনোর প্রভাবে উত্তর আটলান্টিকে বায়ুমণ্ডলের বিভিন্ন উচ্চতায় বাতাসের গতিবেগ ও দিকের পার্থক্য বা ‘উইন্ড শিয়ার’ বাড়তে পারে। এতে ঘূর্ণিঝড়ের সংগঠিত হয়ে ওঠা বাধাগ্রস্ত হয় এবং শক্তিশালী ঝড় তৈরি হওয়ার অনুকূল পরিবেশ কমে যায়।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ পর্যন্ত আটলান্টিকে মাত্র একটি হারিকেন ‘ইসাইয়াস’ সৃষ্টি হয়েছে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা প্যানহ্যান্ডল ও আলাবামায় আঘাত হেনেছে। উপগ্রহ পর্যবেক্ষণের যুগে, অর্থাৎ ১৯৬০-এর দশক থেকে, এত দেরিতে হারিকেন সৃষ্টির ঘটনা আগে ঘটেনি। এর আগে সবচেয়ে দেরিতে হারিকেন সৃষ্টির রেকর্ড ছিল ১১ সেপ্টেম্বর; ২০০২ ও ২০১৩ সালে এই ঘটনা ঘটেছিল।
একটি স্বাভাবিক মৌসুমে এ সময়ের মধ্যে আটলান্টিকে গড়ে ১০টি নামকরণ করা ঝড়, পাঁচটি হারিকেন ও দুটি শক্তিশালী হারিকেন তৈরি হওয়ার কথা। অথচ চলতি বছর এ পর্যন্ত আটটি ক্রান্তীয় ঝড় সৃষ্টি হয়েছে—আর্থার, বার্থা, ক্রিস্টোবাল, ডলি, এডুয়ার্ড, ফে, গনজালো ও হান্না।
৪. ভারতে মৌসুমি বৃষ্টির ঘাটতি, চাপে কৃষি
এল নিনোর সঙ্গে সম্পর্কিত উষ্ণ ও শুষ্ক আবহাওয়ার প্রভাব দেখা যাচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার দেশ ভারতেও। দেশটিতে কৃষির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের তুলনায় ১৩ শতাংশ কম হয়েছে।
ভারতের আবহাওয়া অধিদপ্তর (আইএমডি) সামগ্রিক বৃষ্টিপাতকে ‘স্বাভাবিক’ সীমার মধ্যে বিবেচনা করলেও অঞ্চলভেদে বড় পার্থক্য রয়েছে।
বিবিসির তথ্য অনুযায়ী, মধ্য ভারতে বৃষ্টিপাত প্রায় স্বাভাবিক থাকলেও পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতে তা স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ২৬ শতাংশ কম হয়েছে। এসব অঞ্চলে পরিস্থিতিকে ‘ব্যতিক্রমী খরা’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলোতে বৃষ্টিপাত কমেছে প্রায় ২৪ শতাংশ।
শুধু বৃষ্টির মোট পরিমাণ কম হওয়াই নয়, বৃষ্টিপাতের ধরনও কৃষির জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। স্বাভাবিকের মতো ধারাবাহিক বৃষ্টির বদলে দীর্ঘ শুষ্ক সময়ের পর হঠাৎ ভারী বৃষ্টি হচ্ছে। এতে ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
তবে ভারতের আবহাওয়া একাধিক প্রাকৃতিক ব্যবস্থার প্রভাবে পরিবর্তিত হয়। বিজ্ঞানীদের মতে, এল নিনোই মৌসুমি বৃষ্টির ঘাটতির একমাত্র কারণ নয়।
৫. পূর্ব চীন ও জাপানে শক্তিশালী টাইফুনের আঘাত
পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে, বিশেষ করে পূর্ব চীন ও জাপানসংলগ্ন অঞ্চলে, ঘূর্ণিঝড়ের সক্রিয়তা দেখা যাচ্ছে। ‘মায়সাক’ ও ‘দুজিয়ান’-এর মতো ঝড়ের কারণে সম্প্রতি ওই অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে বন্যা ও ভূমিধস হয়েছে বলে বিবিসির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জাপানের আবহাওয়া সংস্থার তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে ১০টি ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয়েছে। ১৯৬৬ সালের পর কোনো মৌসুমে এ সময় পর্যন্ত এত বেশি ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির ঘটনা ঘটেনি।
এল নিনোর সময় প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণতা ও বায়ুপ্রবাহের পরিবর্তনের কারণে ঘূর্ণিঝড় সাধারণত জাপান ও পূর্ব চীনের কাছাকাছি অঞ্চলের বদলে আরও পূর্বে সৃষ্টি হতে পারে। ফলে স্থলভাগে পৌঁছানোর আগে ঝড়গুলো উষ্ণ সমুদ্রের ওপর দিয়ে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করার সুযোগ পায়। এ সময় সমুদ্র থেকে শক্তি সঞ্চয় করে আরও শক্তিশালী টাইফুনে পরিণত হতে পারে।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, চলতি বছরের বাকি সময়ে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে আরও টাইফুন সৃষ্টি হতে পারে। এর ফলে জাপান ও পূর্ব চীনে নতুন করে ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এল নিনোর প্রভাব সব অঞ্চলে এক রকম নয়। কোথাও এটি খরা ও দাবানলের ঝুঁকি বাড়াতে পারে, আবার কোথাও বৃষ্টিপাত ও ঘূর্ণিঝড়ের ধরন বদলে দিতে পারে। তবে কোনো নির্দিষ্ট দুর্যোগের জন্য এল নিনোকেই একমাত্র দায়ী করা যায় না। স্থানীয় আবহাওয়া, সমুদ্রের অবস্থা এবং অন্যান্য জলবায়ুগত উপাদানও এসব ঘটনার পেছনে ভূমিকা রাখে।