নদীর পানিতে তখন বিকেলের ম্লান আলো। একের পর এক নৌকা এগিয়ে চলেছে। মাঝিদের বৈঠা পড়ছে একই তালে। কোরাসে গান ধরেছেন তারা, মিলিত ধ্বনি উঠছে, ‘হেইও, হেইও’। নদীর দুই পারে তখন মানুষের সারি। কেউ মোবাইল ফোনে মুহূর্তটি তুলে রাখছেন, কেউ প্রিয় দলের নৌকাকে উৎসাহ দিয়ে চেঁচাচ্ছেন।
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) বিকেলে কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার দক্ষিণ চরটেকীতে এই দৃশ্য দেখা গেল। এলাকাটি স্থানীয়ভাবে ‘মিনি কক্সবাজার’ নামে পরিচিত।
স্থানীয়রা জানান, পাকুন্দিয়ায় সর্বশেষ নৌকাবাইচ হয়েছিল প্রায় সাত বছর আগে। সেই হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতেই এবারের আয়োজন। ব্রহ্মপুত্রের দুই পারে জড়ো হয়েছিলেন আশপাশের গ্রামের শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত অসংখ্য মানুষ।
যেন স্বজনদের মিলনমেলা

বাইচ উপলক্ষে আশপাশের বাড়িগুলোতেও ব্যস্ততা ছিল। অনেকে এসেছিলেন দূর থেকে, কেউ পরিবার নিয়ে, কেউ আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে। বাঁধানো পারের ধাপ থেকে শুরু করে বালুচর পর্যন্ত ভরে গিয়েছিল মানুষে।
নারান্দী থেকে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে এসেছেন মেহেদী আলম। দক্ষিণ চরটেকীতে তার নানাবাড়ি, জন্মও এখানেই। তিনি বললেন, “এখানে আমার নানার বাড়ি। জন্মও এখানেই। বউ-বাচ্চা নিয়ে নৌকাবাইচ দেখতে এসেছি, খুব ভালো লাগছে।”
এগারসিন্দুর থেকে আসা সাবেদ আলীও ছিলেন দর্শকদের মধ্যে। তার মতো অনেকেই দীর্ঘদিন পর নদীতে এমন আয়োজন দেখতে পেয়ে পুরোনো দিনের কথা মনে করছিলেন।
বয়স্ক আলিম উদ্দিন বলেন, “একসময় প্রচুর নৌকাবাইচ হইতো। এখন অনেকটাই কমে গেছে। লোকমুখে শুনে এখানে নৌকাবাইচ দেখতে এসেছি। আজকের এই দৃশ্য অতীতের স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছে।”
শত বছরের ঐতিহ্য, কমে আসা আয়োজন
স্থানীয়রা জানান, পাকুন্দিয়ায় নৌকাবাইচের ইতিহাস প্রায় শত বছরের পুরোনো। একসময় প্রতিবছর ভাদ্র মাসে এখানে বাইচ হতো। কিশোরগঞ্জের নদ-নদী ও জলাশয়গুলোতে বর্ষায় বাইচ ছিল গ্রামের মানুষের বিনোদনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ।
তাদের ভাষ্য, কালের পরিক্রমায় নদ-নদীতে নৌযান চলাচলের ধরন বদলে যাওয়া এবং অনেক জলাশয় সংকুচিত হয়ে আসাসহ নানা কারণে এই আয়োজন কমে এসেছে। তাই বাইচের মতো লোকজ ঐতিহ্যকে ঘিরে কিছু হলে মানুষের মধ্যে দেখা যায় ব্যাপক আগ্রহ।
আট নৌকার লড়াই
ছোট-বড় মিলিয়ে আটটি নৌকা অংশ নেয় এবারের প্রতিযোগিতায়। একই রঙের জার্সি পরা মাঝিদের নিয়ে লম্বা নৌকাগুলো পানি কেটে ছুটছিল। শুরু থেকেই ছিল তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা।
শেষ পর্যন্ত প্রথম হয় কটিয়াদী উপজেলার করগাঁওয়ের দুলাল চেয়ারম্যানের নৌকা। পুরস্কার হিসেবে দলটি পায় একটি মোটরসাইকেল। দ্বিতীয় হয় একই এলাকার হাবিবুর রহমান জালাল মিয়ার নৌকা, তাদের পুরস্কার একটি রেফ্রিজারেটর। তৃতীয় স্থান পায় পাকুন্দিয়ার বাহাদিয়ার ইসমাইলের নৌকা, পুরস্কার ৩২ ইঞ্চি এলইডি টিভি। বাকি দলগুলোর জন্য ছিল সান্ত্বনা পুরস্কার।
নতুন প্রজন্মের জন্য
আয়োজক কমিটির সদস্য কুতুব উদ্দিন কিরণ জানান, নৌকাবাইচের মূল উদ্দেশ্য কেবল প্রতিযোগিতা বা ক্ষণিকের বিনোদন নয়। তিনি বলেন, “নৌকাবাইচ গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্য। গ্রামের মানুষকে বিনোদনের সুযোগ করে দেওয়ার পাশাপাশি পুরোনো এই সংস্কৃতির সঙ্গে নতুন প্রজন্মকে পরিচিত করাই আয়োজনের উদ্দেশ্য।” ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে বাইচ আয়োজনের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে ছিলেন কিশোরগঞ্জ-২ (কটিয়াদী-পাকুন্দিয়া) আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মো. জালাল উদ্দিন, পাকুন্দিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রূপম দাস, উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সাবেক চেয়ারম্যান ভিপি কামাল উদ্দিন, থানার ওসি এস এম আরিফুর রহমানসহ স্থানীয় গণ্যমান্যরা।
পারে রয়ে গেল আড্ডা
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার মুখে শেষ হলো বাইচ। নৌকাগুলো একে একে পারে ফিরল। নদীর পানিও ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে এলো। কিন্তু অনেক দর্শক তখনও যাননি। কেউ দিনের গল্প করছিলেন, কেউ পরিচিতদের সঙ্গে আড্ডায় মেতেছিলেন।
ব্রহ্মপুত্রে তখন আর নৌকার দৌড় নেই। থেমে গেছে মাঝিদের হাঁকডাক আর বৈঠার শব্দ। তবে তীরে রয়ে যায় বিকেলের সেই আয়োজনের রেশ।
(স্থানীয় প্রতিনিধির পাঠানো তথ্য নিয়ে তৈরি)