বিজ্ঞাপন

জোনাথনের জিনে কি দীর্ঘায়ুর সূত্র?

jonathan-giant-tortoise-longest-living.jpg
সেন্ট হেলেনার প্ল্যান্টেশন হাউসের চত্বরে বিশ্বের প্রবীণতম স্থলচর প্রাণী জোনাথন। ছবি: সেন্ট হেলেনা সরকার

প্রায় দুই শতাব্দীর জীবন্ত ইতিহাস

দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরে ব্রিটিশ অধীনস্থ প্রত্যন্ত দ্বীপ সেন্ট হেলেনা। এখানকার ‘প্ল্যান্টেশন হাউসের’ সবুজ চত্বরে আজও ধীরেসুস্থে হেঁটে বেড়ায় এক জীবন্ত ইতিহাস। নাম তার জোনাথন। আনুমানিক ১৯৪ বছর বয়সী এই দৈত্যাকার কচ্ছপকে বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘজীবী স্থলচর প্রাণী হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

জোনাথনের সঠিক জন্মতারিখ জানা নেই। ধারণা করা হয়, ১৮৩২ সালের দিকে তার জন্ম; সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের বয়স ছিল মাত্র ২৩ বছর, আর ব্রিটিশ রানি ভিক্টোরিয়ার ১৩। ১৮৮২ সালে সেশেলস থেকে সেন্ট হেলেনায় আনার সময় সে ছিল পূর্ণবয়স্ক। তখন থেকেই দ্বীপটির গভর্নরের সরকারি বাসভবন প্ল্যান্টেশন হাউসের চত্বরে তার ঠিকানা।

জোনাথনের জীবনের সময়কাল এতটাই দীর্ঘ যে, তার জন্মের পর পেরিয়ে গেছে মানুষের বহু প্রজন্ম। তার জীবদ্দশায় পৃথিবী দেখেছে প্রযুক্তি, চিকিৎসা ও যোগাযোগব্যবস্থার বিস্ময়কর পরিবর্তন। অথচ জোনাথন এখনো বেঁচে আছে।

দীর্ঘ জীবনের ছাপ পড়েছে তার শরীরেও। বয়সজনিত ছানির কারণে সে এখন পুরোপুরি দেখতে পায় না। তবু তার জীবন বিজ্ঞানীদের কাছে এক বিস্ময়।

কীভাবে সম্ভব এত দীর্ঘায়ু? মানুষের বার্ধক্য বোঝার ক্ষেত্রে এই প্রাচীন প্রাণী কি কোনো সূত্র দিতে পারে? সম্প্রতি ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’ সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন বিজ্ঞানীরা। জোনাথনের জিনোম ও এপিজিনোম বিশ্লেষণ করে তারা এমন কিছু বৈশিষ্ট্য পেয়েছেন, যা তার দীর্ঘ জীবনের সম্ভাব্য জৈবিক ব্যাখ্যা দিতে পারে।

জিনের ভিন্নতা ও কোষের সুরক্ষা

দৈত্যাকার কচ্ছপের দীর্ঘায়ুর পেছনে ধীর বিপাকপ্রক্রিয়ার ভূমিকা থাকতে পারে বলে বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের ধারণা। বিপাকের মাধ্যমে জীবদেহ খাদ্য থেকে শক্তি তৈরি করে এবং শরীরের প্রয়োজনীয় নানা রাসায়নিক প্রক্রিয়া পরিচালনা করে। তবে কম বিপাকহারই দীর্ঘায়ুর একমাত্র কারণ কি না, তা নিশ্চিত নয়।

জোনাথনের দীর্ঘ জীবনের সম্ভাব্য জিনগত কারণ খুঁজতে গবেষকেরা তার জিনোম—অর্থাৎ সম্পূর্ণ ডিএনএ বিন্যাস—বিশ্লেষণ করেন। পাশাপাশি তারা পরীক্ষা করেন এপিজিনোম, যা ডিএনএর রাসায়নিক পরিবর্তন ও অন্যান্য নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার মাধ্যমে জিনের কার্যক্রম প্রভাবিত করে।

বিশ্লেষণে জোনাথনের ২৮৭টি জিনে স্বতন্ত্র জিনগত ভ্যারিয়েন্ট বা জিনের ভিন্ন সংস্করণ শনাক্ত হয়েছে। এগুলোর কয়েকটি ডিএনএ মেরামত, বিপাক নিয়ন্ত্রণ, টেলোমিয়ার রক্ষণাবেক্ষণ এবং ক্যানসার প্রতিরোধের সঙ্গে সম্পর্কিত জৈবিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত।

ডিএনএ হলো জীবদেহের বংশগত তথ্য বহনকারী অণু। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এটি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। শরীরের ডিএনএ মেরামতব্যবস্থা সেই ক্ষতি সারিয়ে তুলতে সাহায্য করে। অন্যদিকে, টেলোমিয়ার হলো ক্রোমোজোমের প্রান্তে থাকা সুরক্ষামূলক অংশ, যা কোষ বিভাজনের সঙ্গে সম্পর্কিত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়।

জোনাথনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ কিছু জিনের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের বৈশিষ্ট্য তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকার ইঙ্গিত পেয়েছেন গবেষকেরা। তবে প্রতিটি ভ্যারিয়েন্টই তাকে কোষীয় ক্ষতি থেকে সরাসরি রক্ষা করে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। এগুলোর কার্যকারিতা ও তার দীর্ঘায়ুতে সম্ভাব্য ভূমিকা বুঝতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানী ও গবেষণাটির সহলেখক জাস্টিন গারলাচের মতে, জোনাথনের দীর্ঘ জীবনে জিনের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণকারী ব্যবস্থা এবং ডিএনএ মেরামতপ্রক্রিয়ার স্থিতিশীলতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে থাকতে পারে। তবে এ সম্পর্কের প্রকৃতি এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।

ডিএনএ মেরামত ও মাইটোকন্ড্রিয়ার যোগসূত্র

কোষের শক্তি উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে মাইটোকন্ড্রিয়া। বয়স বাড়ার সঙ্গে এর কার্যকারিতায় পরিবর্তন ঘটতে পারে, যা কোষের স্বাভাবিক কাজকে প্রভাবিত করে। তাই বার্ধক্য গবেষণায় মাইটোকন্ড্রিয়ার কার্যক্রম বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।

জোনাথনের গবেষণায় বিজ্ঞানীরা বিশেষভাবে নজর দিয়েছেন ডিএনএ মিথাইলেশন নামের একটি প্রক্রিয়ার দিকে। এতে ডিএনএর নির্দিষ্ট স্থানে রাসায়নিক চিহ্ন যুক্ত হয়, যা জিনের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে পারে। এসব চিহ্নের বিন্যাস কতটা সুশৃঙ্খল বা বিশৃঙ্খল, তা বোঝার একটি পরিমাপক হলো মিথাইলেশন এনট্রপি।

গবেষকেরা জোনাথনের জিনোমের নির্দিষ্ট কিছু নিয়ন্ত্রণকারী অঞ্চলে তুলনামূলকভাবে কম মিথাইলেশন এনট্রপি পেয়েছেন। এসব অঞ্চলে মাইটোকন্ড্রিয়ার শক্তি উৎপাদন এবং আরএনএ প্রক্রিয়াকরণের সঙ্গে সম্পর্কিত জিনের আধিক্য ছিল।

আরএনএ কোষে জিনগত তথ্য ব্যবহার করে প্রোটিন তৈরিসহ বিভিন্ন কাজে ভূমিকা রাখে। এর প্রক্রিয়াকরণে ত্রুটি হলে কোষের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে।

গবেষকদের ধারণা, জিনের নিয়ন্ত্রণকারী অঞ্চলের এমন স্থিতিশীলতা প্রয়োজনীয় জিনের কার্যক্রম যথাযথভাবে বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে। এর ফলে দীর্ঘজীবী প্রাণীর কোষ কীভাবে দীর্ঘ সময় কার্যকর থাকে, তা বোঝার একটি সম্ভাব্য সূত্র পাওয়া যাচ্ছে।

তবে জোনাথনের মধ্যে পাওয়া এই বৈশিষ্ট্যগুলোই তার দীর্ঘায়ুর কারণ, নাকি দীর্ঘ জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত অন্য কোনো প্রক্রিয়ার অংশ—তা এখনো নিশ্চিত নয়।

মানুষের আয়ু বাড়ানোর সূত্র মিলবে?

জোনাথনের জিনগত বৈশিষ্ট্য নিয়ে গবেষণার বড় আগ্রহের কারণ হলো, এর ফলাফল মানুষের বার্ধক্য ও বয়সজনিত রোগ নিয়ে নতুন গবেষণার পথ খুলতে পারে। ডিএনএ মেরামত, জিনের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ এবং মাইটোকন্ড্রিয়ার কার্যকারিতা বজায় রাখার প্রক্রিয়া সম্পর্কে আরও ভালোভাবে জানা গেলে ভবিষ্যতে চিকিৎসাবিজ্ঞানে তার প্রয়োগের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

গবেষণাটির জ্যেষ্ঠ লেখক ও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কালেল ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা স্টিফেন ক্লার্কের আগ্রহ রয়েছে মানুষের মাইটোকন্ড্রিয়ার স্বাস্থ্য উন্নত করতে পারে—এমন চিকিৎসাপদ্ধতি ও ওষুধ নিয়ে। তিনি জানান, দীর্ঘজীবী প্রাণীর জৈবিক বৈশিষ্ট্য থেকে পাওয়া জ্ঞান মানুষের চিকিৎসায় কাজে লাগানোই এ ধরনের গবেষণার অন্যতম লক্ষ্য।

তবে জোনাথনের জিনগত বিশ্লেষণ থেকে এখনই বলা যায় না, কোনো নির্দিষ্ট ওষুধ মানুষের আয়ু বাড়াবে কিংবা বার্ধক্যজনিত রোগ প্রতিরোধ করবে। এসব সম্ভাবনা যাচাই করতে আরও গবেষণা, ওষুধের কার্যকারিতা মূল্যায়ন এবং যথাযথ ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা প্রয়োজন।

কৌতূহলের উপহার থেকে গবেষণার বিষয়

উনিশ শতকে দৈত্যাকার কচ্ছপকে বিরল ও কৌতূহলোদ্দীপক প্রাণী হিসেবে দেখা হতো। দীর্ঘ সময় খাবার ও পানি ছাড়াই বেঁচে থাকার ক্ষমতার কারণে সেশেলস, গ্যালাপাগোস ও মরিশাসের মতো দ্বীপ থেকে সমুদ্রযাত্রার জাহাজে এসব কচ্ছপ ধরে নেওয়া হতো। নাবিকেরা দীর্ঘ যাত্রায় খাবারের মজুত হিসেবে তাদের ব্যবহার করতেন। এ চর্চা বিভিন্ন দ্বীপে কচ্ছপের অস্তিত্বের ওপরও চাপ সৃষ্টি করেছিল।

জোনাথনকে ১৮৮২ সালে সেশেলস থেকে সেন্ট হেলেনায় আনা হয়। তখন সে ছিল পূর্ণবয়স্ক। দ্বীপটির গভর্নরের জন্য উপহার হিসেবে তাকে আনা হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। সেই থেকে দ্বীপটিই তার দীর্ঘ জীবনের ঠিকানা।

আজ তার গুরুত্ব শুধু ঐতিহাসিক নিদর্শন বা পর্যটন আকর্ষণ হিসেবে নয়; বার্ধক্যের জৈবিক প্রক্রিয়া বোঝার ক্ষেত্রেও। তবে গবেষণাটির সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। জোনাথনের মতো একটি প্রাণীর জিনগত বিশ্লেষণ দিয়ে তার দীর্ঘায়ুর সব কারণ নিশ্চিত করা যায় না। গবেষকেরা রক্তের পরিবর্তে মুখের ভেতর থেকে নমুনা সংগ্রহ করেছেন। ফলে জিনের কার্যক্রম সরাসরি পরিমাপের মতো কিছু বিশ্লেষণ করা সম্ভব হয়নি।

এ ছাড়া গবেষণায় জোনাথনের তথ্যের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে আরও চারটি দৈত্যাকার কচ্ছপের তথ্য। এত অল্পসংখ্যক প্রাণীর নমুনা থেকে পুরো প্রজাতির দীর্ঘায়ু সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত টানা যায় না।

গবেষকেরা এখন সেশেলসের আলডাব্রা প্রবালপ্রাচীরের অন্যান্য দৈত্যাকার কচ্ছপের ওপরও অনুরূপ বিশ্লেষণ চালাতে চান। এতে জোনাথনের মধ্যে পাওয়া বৈশিষ্ট্যগুলো তার একান্ত নিজস্ব, নাকি দীর্ঘজীবী এ প্রজাতির অন্য সদস্যদের মধ্যেও রয়েছে, তা বোঝা সহজ হবে।

প্রকৃতির এই ধীরস্থির বাসিন্দা হয়তো মানুষের বার্ধক্য সম্পর্কে সব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে না। কিন্তু তার জিনের ভেতরে থাকা সম্ভাব্য সূত্রগুলো বিজ্ঞানীদের নতুন প্রশ্ন করতে এবং দীর্ঘ জীবন ও সুস্থ বার্ধক্যের জৈবিক ভিত্তি আরও ভালোভাবে বুঝতে সাহায্য করতে পারে। আপাতত, জোনাথনের প্রায় দুই শতাব্দীর জীবন কোনো চূড়ান্ত উত্তর নয়—বরং বিজ্ঞানের জন্য এক বিরল অনুসন্ধানের সূচনা।

তথ্যসূত্র: কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়, গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস, সিএনএন