বিজ্ঞাপন

কেন বছর বছর বদলায় মন্ট ব্ল্যাঙ্কের উচ্চতা?

cable_car_traverses_the_slopes_of_Mont-Blanc_in_Haute-Savoie-France.jpg
ফ্রান্সের ওত-সাভোয়া অঞ্চলের মন্ট ব্ল্যাঙ্কের ঢাল বেয়ে চলাচল করছে কেবল কার। ছবি: দ্য গার্ডিয়ান

পশ্চিম ইউরোপের সর্বোচ্চ পর্বত মন্ট ব্ল্যাঙ্কের চূড়ার উচ্চতা এক বছরে ১ দশমিক ২৯ মিটার কমেছে। ফ্রান্সের আল্পস অঞ্চলে অবস্থিত পর্বতটির চূড়া বর্তমানে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪ হাজার ৮০৭ দশমিক ৪৭ মিটার উঁচুতে রয়েছে। বুধবার (১৪ অক্টোবর) নতুন এই পরিমাপের তথ্য জানিয়েছেন একদল ভূমি জরিপকারী।

‘ইউরোপের ছাদ’ হিসেবে পরিচিত মন্ট ব্ল্যাঙ্ক বা ফরাসিতে মোঁ ব্লঁ; যার অর্থ ‘শুভ্র পর্বত’। এর চূড়ার উচ্চতা প্রতিবছর একই থাকে না। তাপমাত্রা, বাতাস ও বৃষ্টিপাতের প্রভাবে চূড়ায় জমে থাকা বরফ ও তুষারের পুরুত্ব বদলায়। ফলে পরিমাপ করা উচ্চতাও বছর বছর ওঠানামা করে।

২০২৫ সালের তুলনায় এবার চূড়াটির উচ্চতা ১ দশমিক ২৯ মিটার কম পাওয়া গেছে। তবে ২০২৩ সালের তুলনায় গত মাসে অভিযানের সময় রেকর্ড করা উচ্চতা ছিল ১ দশমিক ৮৮ মিটার বেশি। ২০২৩ সালে সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে মন্ট ব্ল্যাঙ্কের উচ্চতা সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছিল।

মন্ট ব্ল্যাঙ্কের পাথুরে পর্বতশরীরের উচ্চতা প্রায় ৪ হাজার ৭৯২ মিটার। চূড়ায় জমে থাকা বরফ ও তুষারের স্তরের কারণে জরিপে পাওয়া উচ্চতা এর চেয়ে বেশি হয়।

২০০১ সাল থেকে নিয়মিত পর্বতটির চূড়া পরিমাপ করে আসছেন ফ্রান্সের দুটি পেশাজীবী সংগঠন—ইউনিয়ন ন্যাশনাল দে জিওমেত্র-এক্সপার্টস (ইউএনজিই) এবং অর্দ্র দে জিওমেত্র-এক্সপার্টসের জরিপকারীরা। উচ্চতা নির্ণয়ে তারা স্যাটেলাইট প্রযুক্তি ব্যবহার করেন। পাশাপাশি ড্রোনের সাহায্যে চূড়ার বরফ ও তুষারের স্তরের বিস্তারিত মডেল তৈরি করেন।

জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৭ সালে মন্ট ব্ল্যাঙ্কের চূড়ার উচ্চতা ছিল ৪ হাজার ৮১০ দশমিক ৯০ মিটার। সেই সর্বোচ্চ পরিমাপের তুলনায় বর্তমানে উচ্চতা ৩ দশমিক ৪৩ মিটার কম।

তবে উচ্চতার এই ওঠানামাকে আল্পস অঞ্চলের হিমবাহ গলে যাওয়ার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করার বিষয়ে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে সৃষ্ট দূষণ ও বৈশ্বিক উষ্ণায়ন আল্পসের বরফ গলার অন্যতম কারণ হলেও, শুধু চূড়ার উচ্চতা দিয়ে বরফের মোট ক্ষয় নির্ধারণ করা যায় না।

ইউএনজিইর একজন মুখপাত্র বলেন, বরফের ভরের পরিবর্তন বুঝতে হলে চূড়ার উচ্চতার পরিবর্তন এবং বরফের মোট আয়তন বা ভরের পরিবর্তন আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হবে।

তার ভাষায়, ‘চূড়ার উচ্চতা বেড়ে যাওয়ার অর্থ এই নয় যে পর্বতটিতে বরফের ভর বেড়েছে। একইভাবে, এর অর্থ আল্পসের হিমবাহগুলোর পশ্চাদপসরণের প্রমাণকে অস্বীকার করাও নয়।’

চলতি বছর পশ্চিম ইউরোপে রেকর্ড উষ্ণতম গ্রীষ্মের পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের ভূমিকা ছিল। এর প্রভাবে আল্পসের বিভিন্ন এলাকায় বরফ দ্রুত গলেছে।

চলতি মাসের শুরুতে সুইজারল্যান্ডের হিমবাহ বিশেষজ্ঞরা দেশটির বরফ গলার হার দ্রুত বেড়ে যাওয়ার বিষয়ে সতর্ক করেন। তাদের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে সুইজারল্যান্ডের মোট বরফের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হারিয়ে গেছে। ২০২৫ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে বরফের আয়তন কমেছে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ।

মন্ট ব্ল্যাঙ্ক অভিযানের নেতা এবং ফ্রান্সের ওত-সাভোয়া বিভাগের ভূমি জরিপকারীদের চেম্বারের সভাপতি জাঁ দে গারে বলেন, আল্পসের অন্য অংশে উষ্ণায়নের প্রভাব খালি চোখেই দেখা যায়। তবে ৪ হাজার মিটারের বেশি উচ্চতায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব একই মাত্রায় পড়ছে বলে আপাতত মনে হচ্ছে না।

বুধবার ফরাসি টেলিভিশন চ্যানেল টিএফ১-কে তিনি বলেন, পর্বতে ওঠার পথে তেত-রুশ হিমবাহের আগে ব্রিগাদ ব্লাঞ্চ কুটিরের পাশ দিয়ে যেতে হয়। সেখানে হিমবাহের পরিবর্তন তারা নিজের চোখেই দেখেছেন।

‘হিমবাহটি আরও ওপরে সরে গেছে। এটি আক্ষরিক অর্থেই আমাদের চোখের সামনে গলে গেছে। এখন কিছু জায়গায় হিমবাহের বদলে পানির ধারা পার হতে হচ্ছে,’ বলেন তিনি।

তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান